সব বৃষ্টি ঝড় নিয়ে আসে না – সুপ্রিয় রায়

কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে আমেরিকার Washington State-এ গেছি । Seattle, Bellevue, Renton—এই দিকটায় বেশ কিছুটা সময়ও কাটিয়েছি।

প্রতিবারই ওখানে গিয়ে একটা ব্যাপার আমাদেরকে বেশ অবাক করেছে —  

ওখানে বৃষ্টি হয়, কিন্তু বৃষ্টির সঙ্গে বাজের যেন কোনও বন্ধুত্বই নেই।  

আমাদের দেশে অর্থাৎ ভারতবর্ষে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা একটু অন্যরকম।

আকাশ কালো হয়েছে মানেই মনে হয়,“ব্যস, এবার কিছু একটা হতে চলেছে!” তারপর হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকাল, মেঘ গর্জে উঠল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝম করে বৃষ্টি।

কখনও সেই বৃষ্টি এত প্রবল যে মনে হয় আকাশের কোথাও একটা বিশাল কল খুলে গেছে!

বৃষ্টি আর বাজের যুগলবন্দি আমাদের কাছে এতটাই পরিচিত যে, বাজ না পড়লে যেন মনে হয় বৃষ্টিটাই ঠিক জমল না।

কিন্তু Seattle-এর বৃষ্টি একেবারে অন্য মেজাজের।

সকাল থেকে আকাশ মুখ ভার করে আছে।মেঘ করেছে।তারপর শুরু হল টুপটাপ বৃষ্টি।

কিন্তু কোথায় সেই বাজ? কোথায় সেই মেঘের গর্জন?

মনে হয় বৃষ্টি নামানোর আগে মেঘ আর বজ্রদেবতার মধ্যে একটু ঝগড়া হয়েছিল!এখানে মেঘ বাবাজি খুব শান্ত স্বভাবের মানুষ।এসেছেন, নিজের কাজটুকু করছেন, কাউকে বিরক্তও করছেন না! আসলে এর পিছনেও প্রকৃতির নিজের একটা গল্প আছে।

Seattle-এর খুব কাছে বিশাল Pacific Ocean। সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস আর চারপাশের পাহাড় এখানকার আবহাওয়াকে অনেকটাই শান্ত রাখে। ফলে ভারতের মতো প্রচণ্ড গরম, আর্দ্রতা আর অস্থির বাতাস মিলে যে বিশাল বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি করে, এখানে তা তুলনামূলকভাবে কম হয়।

তাই এখানকার বৃষ্টি অনেক সময় রাগী নয়, অভিমানী।

চিৎকার করে আসে না—আস্তে আস্তে আসে।

দরজা-জানলা কাঁপায় না—শুধু কাঁচের ওপর টুপটাপ শব্দ করে।

আর চলে যাওয়ার সময়ও কোনও ঘোষণা দেয় না।

তবে শুনেছি Washington-এ বাজ একেবারেই পড়ে না, তা নয়। পাহাড়ি Cascade অঞ্চলে বজ্রঝড় দেখা যায়। কিন্তু Seattle-এর মতো Puget Sound-এর নিচু এলাকায় তা তুলনামূলকভাবে কম ।

তাই এত বছর এখানে এসে আমাদের মনে হয়েছে— Seattle-এর বৃষ্টি যেন বলে: “চুপচাপ একটু ভিজিয়ে দিয়ে যাই… কারও অসুবিধা হবে না।”

কী আশ্চর্য এই পৃথিবী!

একই আকাশ, একই মেঘ, একই জল—তবু জায়গা বদলালেই তাদের আচরণ বদলে যায়।

হয়তো বাস্তব জীবনে — সব বৃষ্টি ঝড় নিয়ে আসে না। কিছু বৃষ্টি শুধু নীরবে এসে মনটাকে একটু ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

Leave a comment