এবার আমেরিকায় গিয়ে একটা বিষয় বেশ চোখে পড়ল। আমরা যে এলাকায় ছিলাম, সেখানে ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো।
এর একটা বড় কারণ খুব স্বাভাবিক—ওই অঞ্চলে Amazon, Microsoft, Google-এর মতো বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি সংস্থার অফিস রয়েছে। সেখানে প্রচুর ভারতীয় পেশাদার কাজ করেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করেন। আর একজন ভারতীয় যেখানে থাকেন, ধীরে ধীরে সেখানে আরও ভারতীয় পরিবার, দোকান, রেস্তোরাঁ, সাংস্কৃতিক সংগঠন—সবকিছুই গড়ে উঠতে থাকে।
ফলে আমেরিকার সেই এলাকাগুলিতে দাঁড়ালে অনেক সময় মনে হয়, যেন ভারতেরই কোনও আধুনিক শহরের আর একটি সংস্করণ! ভারতীয় মুদিখানা থেকে শুরু করে মিষ্টির দোকান, রেস্তোরাঁ—মোটামুটি ভারতে যে জিনিসগুলি পাওয়া যায়, তার অনেকটাই সেখানেও পাওয়া যায়।
কিন্তু এই ভারতীয়-অধ্যুষিত পরিবেশের মধ্যে একটা বিষয় আমাদের বিশেষভাবে নজরে এল—ভারতীয়দের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের সংখ্যা যেন তুলনামূলকভাবে বেশ কম।
বিষয়টি কেবল আমাদের চোখে পড়া একটি অভিজ্ঞতা হিসেবেই না রেখে একটু খোঁজখবর নিতে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে একটা বৃহত্তর ছবি ও কিছু পরিসংখ্যান সামনে এল।
বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে আন্ধ্রপ্রদেশ, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, গুজরাট, দিল্লি, তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্ণাটক বহু বছর ধরেই এগিয়ে।
আর বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা ইত্যাদি রাজ্য থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বিদেশে যায়।
দেখলাম ভারতের কিছু রাজ্যে বহু বছর ধরেই বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কোথাও তার পেছনে রয়েছে শিক্ষা ও পেশাগত সুযোগ, কোথাও বিদেশে আগে থেকে থাকা আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের নেটওয়ার্ক, কোথাও আবার নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিবাসন-সম্পর্ক।
একজন আগে গেলেন, তারপর তাঁর পরিচিত বা আত্মীয় গেলেন, তারপর আরও কয়েকজন গেলেন। ধীরে ধীরে একটা community network তৈরি হল। নতুন কেউ বিদেশে যেতে চাইলে তার সামনে তখন পথটাও অনেক সহজ হয়ে গেল—কোথায় থাকা যায়, কোথায় চাকরি খোঁজা যায়, কোন এলাকায় নিজের রাজ্যের মানুষ পাওয়া যাবে—এসব তথ্য হাতের কাছেই পাওয়া যায়।
আমেরিকায় গিয়ে ভারতীয়দের যে ঘনবসতি আমরা দেখেছি, তার পিছনেও এই সামাজিক ও পেশাগত নেটওয়ার্কের ভূমিকা কম নয়।
আর সেখানেই হয়তো আমাদের চোখে পড়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—এই বিশাল ভারতীয় প্রবাসী সমাজে পশ্চিমবঙ্গের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে এতটা চোখে পড়ে না কেন?
এটা কি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কম হওয়ার কারণে?
নাকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে যারা বিদেশে যান, তাঁদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন শহর ও দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকেন?
নাকি অন্ধ্রপ্রদেশ, পাঞ্জাব, গুজরাট, তামিলনাড়ু বা কেরালার মতো কিছু রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গের এখনও তেমন শক্তিশালী বিদেশভিত্তিক সামাজিক ও পেশাগত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়নি?
নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত ও সামাজিক কারণ?
পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কি সত্যিই কম, নাকি আমরা অন্য রাজ্যগুলোর তুলনায় একটু বেশি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছি? নাকি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিদেশে যাওয়ার গল্পটা অন্যরকম?