চরিত্র – বর্ণনাকারী , লিপি , প্রথম বান্ধবী , দ্বিতীয় বান্ধবী , তৃতীয় বান্ধবী
(আনন্দময় আবহ। বান্ধবীরা লিপির বাড়িতে এসেছে।)
বর্ণনাকারী:আজ লিপির বাড়িতে উৎসবের দিন। নতুন অতিথি এসেছে—একটি ফুটফুটে নাতনি। সেই আনন্দ ভাগ করে নিতে এসেছে তার বান্ধবীরা ।
লিপি: আরে আয় আয় । তোদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। বোস , বোস। আগে কি খাবি বল ?
প্রথম বান্ধবী : আগে মিষ্টি খাওয়া। নাতনি হওয়ার খবর শুনে তো আমরা আর বসে থাকতে পারিনি।তাই চলে এলাম ।
তৃতীয় বান্ধবী : কোথায় আমাদের ছোট্ট রাজকন্যা?
লিপি (হেসে):এখন ঘুমোচ্ছে। তবে তোরা এসেছিস , খুব ভাল করেছিস , প্রাণভরে ওকে একটু আশীর্বাদ করে যা ।
দ্বিতীয় বান্ধবী : আশীর্বাদ তো দেবই। তার আগে একটা কথা বলব?
লিপি: অবশ্যই বল।
প্রথম বান্ধবী : আজ কিন্তু শুধু মিষ্টি খেতে আসিনি, আমাদের নাতনির জন্য আমরা কিছু স্বপ্নও নিয়ে এসেছি।
লিপি: স্বপ্ন?
তৃতীয় বান্ধবী : হ্যাঁ, এমন স্বপ্ন যাতে ও বড় হয়ে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হয়।
দ্বিতীয় বান্ধবী : ঠিক তাই। তবে স্বপ্ন বলার আগে এই আনন্দের দিনে আমাদের বন্ধুত্বের গানটা চল না একবার গাই ।
লিপি: ওকে চল ……… তুই ধর গানটা
প্রথম গান
বন্ধুত্বের রঙে রাঙানো দিন,
হাসি আর গল্পে কাটে প্রতিদিন।
দুঃখ এলে হাতটা ধরি,
সবাই মিলে গান করি।
সবাই মিলে একসাথে,
হাসবো গাইবো প্রাণ খুলে।
বন্ধুত্ব হোক শক্তি মোদের,
জীবন চলুক দোলায় দুলে।
হাতে হাত রেখে চলবো পথে,
স্বপ্ন বুনি নতুন রথে।
বন্ধুত্বের এই বন্ধন,
রাখবো মোরা সারাজীবন।
(সবাই হাত তালি দেয়)
প্রথম বান্ধবী : দেখ লিপি , ওর জন্য পুতুল কিনবি , খেলনা কিনবি —সেটা ঠিক আছে। কিন্তু শুধু পুতুল, রান্নাবাটি আর সংসার খেলার মধ্যেই যেন ওর পৃথিবী আটকে না যায়।
লিপি : কেন? আমরা তো ছোটবেলায় এসবই খেলেছি।
তৃতীয় বান্ধবী : সেটাই তো সমস্যা। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয়—তোমার কাজ রান্না করা, সংসার সামলানো, অন্যের যত্ন নেওয়া।
দ্বিতীয় বান্ধবী : আর ছেলেদের দেওয়া হয় গাড়ি, বিমান, বিজ্ঞান কিট, খেলাধুলার সরঞ্জাম। যেন তাদের জন্য পৃথিবীটা বড়, আর মেয়েদের জন্য ঘরের চার দেওয়াল।
লিপি (চিন্তিত): তোদের কথায় যুক্তি আছে। তবে সংসার শেখাটাও তো দরকার।
প্রথম বান্ধবী : অবশ্যই দরকার। কিন্তু সংসার সামলানো শুধু মেয়েদের দায়িত্ব—এই ধারণাটা দরকার নেই।
লিপি: তোরা এত সুন্দর করে বলছিস, কিন্তু আমাদের সময় তো এসব ভাবার সুযোগ ছিল না।
প্রথম বান্ধবী : সেটাই তো বলছি। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হতো—তোমার পৃথিবী ঘরের মধ্যে।
তৃতীয় বান্ধবী : পুতুল খেলা, রান্নাবাটি, সংসার—সব যেন আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া।
দ্বিতীয় বান্ধবী : আর সেই কারণেই কত মেয়ের স্বপ্ন চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে গেছে।
বান্ধবী : এই চার দেওয়ালের মধ্যে আমাদের বাঁধা জীবন নিয়ে তোদের আমি একটা গান শোনাচ্ছি ।
সবাই : শোনা , শোনা
(একটু নীরবতা। আবহসঙ্গীত ধীরে বাজে।)
দ্বিতীয় গান
চার দেয়ালে বাঁধা জীবন,
স্বপ্নগুলো বন্দী আজ।
নিজের কথা বলতে গেলেই,
কেন যে লাগে লজ্জা আজ?
মনের মাঝে কত আশা,
ডানা মেলে উড়তে চায়,
অজানা সব পথের ডাকে
হৃদয় আমার সাড়া দেয়।
চার দেয়ালের সীমার বাইরে
আকাশ ডাকে বারেবার,
মেয়েরাও তো মানুষ সবার,
স্বপ্ন দেখার সমান অধিকার।
(সবাই হাত তালি দেয়)
তৃতীয় বান্ধবী : তোর নাতনি যদি ডাক্তার হতে চায়, বিজ্ঞানী হতে চায়, পাইলট হতে চায়, লেখক হতে চায়—তবে তার সেই স্বপ্ন দেখার সাহস ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে।
দ্বিতীয় বান্ধবী : ওকে বলিস —”তুমি যা হতে চাও, তাই হতে পারো।”
প্রথম বান্ধবী : ওকে খেলতে দাও ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা। ওকে বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে শেখাও। প্রশ্ন করতে শেখাও।
লিপি : ঠিকই বলেছ। আমরা ছোটবেলায় কত কথা শুনেছি—”মেয়েরা এটা করে না, ওটা করে না।”
তৃতীয় বান্ধবী : আর সেইসব কথাই অনেক মেয়ের স্বপ্নকে ছোট করে দিয়েছে।
লিপি (আবেগভরা কণ্ঠে): সত্যিই তো! কত মেয়ের ইচ্ছে, প্রতিভা, স্বপ্ন—সব চাপা পড়ে গেছে সমাজের নিয়মের নিচে।
প্রথম বান্ধবী : তাই তোর নাতনির ক্ষেত্রে যেন সেটা না হয়।
তৃতীয় বান্ধবী : ওকে শুধু সংসার নয়, পৃথিবীটাকেও চিনতে শেখাবি ।
দ্বিতীয় বান্ধবী : ওকে শেখাবি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে। আমরা আন্তরিকভাবে চাই, তোর নাতনি বড় হয়ে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হোক।
প্রথম বান্ধবী : কেউ যেন না বলে—”ও অমুকের মেয়ে”, “তমুকের বউ”।
তৃতীয় বান্ধবী : মানুষ যেন বলে—”ও নিজে একজন সফল মানুষ।”
লিপি : সত্যিই তো! একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার আত্মবিশ্বাস।
প্রথম বান্ধবী : আর সেই আত্মবিশ্বাস আসে শিক্ষা থেকে।
দ্বিতীয় বান্ধবী : আসে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থেকে।
তৃতীয় বান্ধবী : আসে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা থেকে।
লিপি : আমি চাই, ও বড় হয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হোক।
তৃতীয় বান্ধবী : ঠিক বলেছিস , নিজের উপার্জন থাকলে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
প্রথম বান্ধবী : আর আত্মবিশ্বাসী মানুষই সমাজকে বদলাতে পারে।
দ্বিতীয় বান্ধবী : ওকে বলবি —”তুমি কারও ছায়া নও, তুমি নিজেই এক আলো।”
বান্ধবী : এর ওপরে আমার জানা একটা গান আছে । তোরা যদি বলিস তাহলে গাইতে পারি ।
সবাই : তাড়াতাড়ি শুরু কর
তৃতীয় গান
ডানা মেলে উড়তে শেখ,
আকাশটাকে ছুঁতে শেখ।
ভয়কে পেছনে ফেলে দিয়ে,
নিজের পথে চলতে শেখ।
তুই তো শুধু কারও মেয়ে নয়,
তুই যে নিজের পরিচয়।
স্বপ্নগুলো আঁক রঙিন করে,
জয় কর নতুন সময়।
ডানা মেলে উড়তে শেখ,
আকাশটাকে ছুঁতে শেখ।
বিশ্বজয়ের প্রত্যয়ে তুই,
নতুন দিনের সূর্য দেখ।
(সবাই হাত তালি দেয়)
লিপি (আবেগভরা কণ্ঠে): জানিস , তোদের কথা শুনে মনে হচ্ছে আমার নাতনির জন্য শুধু আশীর্বাদ নয়, একটা প্রতিশ্রুতিও দরকার।
প্রথম বান্ধবী : কী প্রতিশ্রুতি?
লিপি : আমরা ওকে মানুষ হিসেবে বড় করব, শুধু মেয়ে হিসেবে নয়।
তৃতীয় বান্ধবী : বাহ! এটাই তো সবচেয়ে বড় কথা।
দ্বিতীয় বান্ধবী :ওকে শেখাবে নিজের সম্মান করতে।
লিপি :ওকে শেখাব নিজের পায়ে দাঁড়াতে।
প্রথম বান্ধবী : ওকে শেখাবে স্বপ্ন দেখতে।
লিপি (আবেগভরা কণ্ঠে): আজ আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমাদের নাতনিকে শুধু “ভালো মেয়ে” নয়, একজন স্বাধীন, শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব।
সবাই: এই হোক আগামী দিনের প্রতিজ্ঞা।
বর্ণনাকারী:
একটি শিশুর হাতে পুতুল তুলে দেওয়া ভুল নয়। ভুল হলো তার হাতে শুধু পুতুলই তুলে দেওয়া।
একটি মেয়েকে সংসার শেখানো ভুল নয়। ভুল হলো তাকে বোঝানো যে তার পৃথিবী শুধু সংসারেই সীমাবদ্ধ।
আজকের মেয়েরা শুধু কারও মেয়ে, স্ত্রী বা মা নয়—তারা ডাক্তার, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, শিল্পী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, মহাকাশচারী।
তাই প্রতিটি কন্যাশিশুর জন্য হোক নতুন প্রতিজ্ঞা—
“তুমি শুধু কারও পরিচয়ে নয়, নিজের পরিচয়ে বড় হবে। নিজের স্বপ্নে, নিজের শক্তিতে, নিজের আলোয়।”
সবাই মিলে (কোরাস):
চতুর্থ গান
না বলা কথা আজ বলবো,
ভয়কে পায়ে দলে চলবো।
শৃঙ্খল যত ভাঙবো মোরা ,
নতুন করে গড়বো ভোর।
আমি স্বাধীন, আমি আলো,
আমার ডানায় উড়বে ভালো।
ভাঙবো সব বাধা, গড়বো সমাজ,
সবাই মিলে একসাথে আজ ।
একদিন সব ভাঙবে শিকল,
মুছবে চোখের জলও তাই,
নিজের স্বপ্ন নিজের হাতে
রঙিন করে সাজাবো ভাই।
(আবহসঙ্গীতের মধ্যে নাটক শেষ।)