আমাদের চোখে আমেরিকা বনাম ভারত – সুপ্রিয় রায়

বেশ কয়েকবার আমরা আমেরিকায় এসে কিছুদিন করে থেকে বুঝলাম—দেশ দুটো আলাদা হওয়ার চেয়েও মজার ব্যাপার হলো, জীবন চালানোর “সফটওয়্যার” দু’দেশে একটু আলাদা! আমেরিকা আর ভারতের জীবনযাত্রা যেন একই সিনেমার দুই রকম চিত্রনাট্য!  আমেরিকা ও ভারতের জীবনযাত্রা নিয়ে আমাদের মজার কিছু অভিজ্ঞতা সহজ করে বলার চেষ্টা করছি –

১. স্বাধীনতা

আমেরিকায় স্বাধীনতার সংজ্ঞা বেশ সরল—“My life, my decision.”

ভারতে একই কথা বলা হয়, তবে একটু সংশোধন করে—আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত… তবে আগে মা-বাবার সঙ্গে একটু আলোচনা করি!”

আর সেই আলোচনা কখন শেষ হবে, তার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই!

২. পরিবার

আমেরিকায় সন্তান ১৮ বছরে পা দিলেই—“Now you are an adult. Start your own life.”

ভারতে সন্তান ৩০ পার করলেও মায়ের প্রশ্ন—বাবা, কোথায় যাচ্ছিস? কখন ফিরবি? খেয়ে ছিস তো?”

৩. বিয়ে

আমেরিকায়—আমি কাকে ভালোবাসি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

ভারতে—ভালোবাসো, খুব ভালো কথা। কিন্তু বাড়ি কোথায়? চাকরি কী? পরিবার কেমন? জাত কী?”

তারপর শুরু হয় আসল তদন্ত! মনে হয় বিয়ে নয়, সরকারি চাকরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছে!

৪. প্রেম

আমেরিকায়ভালো লাগছে, দেখি সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।”

ভারতে—ভালো লাগছে? বেশ! বিয়েটা কবে?”

এখানে প্রেমের সঙ্গে ভবিষ্যতের বিয়ের বাজেটও প্রায় একইসঙ্গে তৈরি হয়ে যায়!

৫. ক্যারিয়ার

আমেরিকায় বলা হয়—Do what you love.”

ভারতে বলা হয়—যা ভালোবাসো করো… তবে সরকারি চাকরিটা পেলে মন্দ হয় না!”

আর সরকারি চাকরি পেলে আত্মীয়স্বজনের কাছে আপনার সম্মান এমন বাড়বে, যেন আপনি একাই দেশের অর্থনীতি সামলে ফেলেছেন!

৬. টাকা

আমেরিকায়—আমি কত আয় করি, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।

ভারতে—কত আয় করো? বাড়ি কিনেছ? গাড়ি আছে? বিয়ে কবে?”

শেষ প্রশ্নটার সঙ্গে প্রথম তিনটির সম্পর্ক কী—সেটা আজও আমরা বুঝে উঠতে পারিনি!

৭. প্রতিবেশী

আমেরিকায় পাশের বাড়িতে কে থাকে, অনেক সময় সেটাই জানা থাকে না।

ভারতে পাশের বাড়ির কাকিমা আপনার—চাকরি, বেতন, বউ, ছেলে-মেয়ে, এমনকি শ্বশুরবাড়ির খবরও জানেন!

আপনি নিজে যতটা নিজের জীবন জানেন, তাঁর জানা থাকে তার চেয়েও একটু বেশি।

৮. ব্যক্তিগত গোপনীয়তা

আমেরিকায়—That’s private.”

ভারতে—আরে বলো না! আমরা তো আপন মানুষ!

এই “আপন মানুষ” কথাটার আড়ালেই অনেক সময় আপনার ব্যক্তিগত জীবনের পুরো ফাইলটা বেরিয়ে আসে!

৯. সন্তান পালনের ধরন

আমেরিকায়—“Choose your own path.”

ভারতে—নিজের পথ নিজে বেছে নিতে পারো… তবে আমরা যে পথটা বলছি, সেটাই মনে হয় তোমার ঠিক হবে!”

অর্থাৎ স্বাধীনতা আছে—কিন্তু GPS-টা বাবা-মায়ের হাতে!

১০. ব্যর্থতা

আমেরিকায়—Failed? Learn from it and try again.”

ভারতে—ব্যর্থ হয়েছ? ঠিক আছে… কিন্তু আত্মীয়পরিজনদের সামনে ব্যাপারটা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?”

কারণ ভারতে নিজের ব্যর্থতার চেয়ে কখনও কখনও আত্মীয়দের প্রশ্ন সামলানোই কঠিন!

১১. কাজ

আমেরিকায়—Work is important, but life is bigger than work.”

ভারতে—কাজটা আগে শেষ করি, তারপর জীবনটা দেখা যাবে!”

আর সেই “পরে”টা কখন আসে, সেটা অনেকেই অবসরের পরেও খুঁজে পান!

১২. সময়

আমেরিকায় কেউ বলল—Let’s meet at 7 PM.”

৭টা মানে প্রায় ৭টাই।

ভারতে—৭টার দিকে আসছি।

এর অর্থ হতে পারে ৭টা, ৭টা ২০, ৭টা ৪৫… এমনকি ৮টাও!

“দিকে” শব্দটার মধ্যে আমাদের অসাধারণ স্বাধীনতা লুকিয়ে আছে!

১৩. নিয়মকানুন

আমেরিকায়—Rule is rule.”

ভারতে—নিয়ম তো নিয়মই… তবে একটু পরিচিত লোক থাকলে ব্যাপারটা সহজ হতে পারে!”

অবশ্য এটাও ভারতের অভিজ্ঞতার একটি পরিচিত রসিকতা—সব জায়গায় যে এমন হয়, তা নয়।

১৪. ধর্ম

আমেরিকায় ধর্ম অনেকটাই ব্যক্তিগত বিষয়।

ভারতে—বিশ্বাস যার যার, উৎসব সবার।

দুর্গাপুজো হোক, দীপাবলি, ঈদ, বড়দিন বা অন্য কোনও উৎসব— উৎসবের আনন্দে সবাইকে সামিল করে নেওয়ার এই সংস্কৃতিই তো ভারতের একটা সুন্দর দিক।

১৫. বৃদ্ধ বাবা-মা

আমেরিকায় সন্তান আলাদা থাকলেও বাবা-মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং প্রয়োজনমতো সাহায্য করার সংস্কৃতি খুব স্বাভাবিক।

ভারতে প্রশ্নটা একটু অন্যরকম—বাবা-মাকে ছেড়ে আলাদা থাকব?”

এই প্রশ্নটাই অনেক পরিবারের কাছে আবেগের।

এখানে দূরত্ব শুধু মাইল দিয়ে মাপা হয় না—মনের দূরত্ব দিয়েও মাপা হয়।

১৬. উচ্ছে বা করলা

এবার আসি আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়ে—করলা!

ভারতে করলা এমন সাধারণ সবজি, বাজারে গেলে না পেলেই বরং সন্দেহ হয়—

“আজ বাজারে কী হয়েছে?”

কিন্তু আমেরিকার Walmart, Target বা Safeway-এর মতো mainstream grocery store-এ করলা সবসময় সহজে চোখে পড়ে না।

তখন মনে হয়—যে সবজি ভারতীয়দের জীবনে তিক্ততা কমিয়ে স্বাস্থ্য বাড়ায়, আমেরিকা তাকে এখনও পুরোপুরি চিনে উঠতে পারেনি!”

১৭. রাস্তা ও হর্ন

আমেরিকার রাস্তায় একটা জিনিস খুব চোখে পড়ে—গাড়ি চলছে, মানুষ চলছে… কিন্তু হর্ন যেন ছুটিতে!

হর্ন বাজানো মানেই যেন—ভাই, খুব জরুরি কিছু একটা ঘটেছে!”

আর ভারতে?

গাড়ি স্টার্ট হলো—প্যাঁ পোঁ!

সামনে গাড়ি—প্যাঁ পোঁ!

পাশে মানুষ—প্যাঁ পোঁ!

রাস্তা ফাঁকা—তবুও…প্যাঁ পোঁ!

মনে হয় গাড়ির সঙ্গে হর্নটাও বলছে—আমি আছি, চিন্তা করো না!”

১৮. ইলেকট্রিক সুইচ

এবার এল ছোট্ট কিন্তু মজার সাংস্কৃতিক পার্থক্য।

ভারতে অনেক জায়গায় আলো জ্বালাতে সুইচ নিচে নামাই

আমেরিকায় সাধারণ wall switch-এ সাধারণত উপরে = ON, নিচে = OFF

তাই প্রথম প্রথম আমেরিকায় এসে আলো জ্বালাতে গিয়ে আমরা সুইচ নিচে নামাচ্ছি—
আলো জ্বলছে না!

তারপর ছেলে বলল—উপরে তোলো!”

মনে হলো, আলো জ্বালানোর জন্যও বুঝি এখানে একটু উন্নতির দিকে উঠতে হয়!

১৯. বাড়ি

আমেরিকা: বড় বাড়ি, কিন্তু মানুষ কম।
ভারত: বাড়ি ছোট হলেও মানুষ, আত্মীয় আর অতিথির সংখ্যা—সীমাহীন!

২০. সর্বশেষে আসি পোশাকে  

আমেরিকায় — নিজের পছন্দের স্বাধীনতা।
ভারতে —নিজের পছন্দ + সমাজের পছন্দ

শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে হয়েছে, আমেরিকা আর ভারতকে শুধু “কোনটা কেমন” দিয়ে বিচার করাটা ঠিক হবে না।কেননা দুটো দেশের জীবনযাপন আলাদা, অভ্যাস আলাদা, সামাজিক নিয়ম আলাদা ।

তাই হয়তো সবচেয়ে মজার কথাটা এটাই—

আমেরিকা শেখায়—“নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচো।”
আর ভারত বলে—“অবশ্যই বাঁচো… তবে খেয়ে নিয়ে বাঁচো, আর কোথায় যাচ্ছ সেটা জানিয়ে যেও!”

একই জীবন, দুই রকম দর্শন— আর সেই পার্থক্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের ভ্রমণের কত হাসি, কত গল্প, কত স্মৃতি।

Leave a comment