বাংলার স্বাদে শুরু, গোল্ডেন গার্ডেনসের নীল জলে শেষ—সিয়াটেলে আমাদের সুন্দর একদিন – সুপ্রিয় রায়

যেহেতু আমেরিকার বেলেভিউতে এসেছি মাত্র তিন দিন, তাই আমাদের নিয়ে আমাদের প্রিয়জনদের বেশ চিন্তা—এখনও নাকি আমাদের ‘জেট ল্যাগ’ চলছে! যদিও আমাদের শরীর-মনের কোথাও তার বিশেষ লক্ষণ খুঁজে পাচ্ছি না। বরং মনে হচ্ছে, জেট ল্যাগ সাহেব বোধহয় আমাদের ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছেন না!

তাই আপাতত খুব বেশি দূরে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, সকালে জলখাবার সেরে, স্নান-টান করে বেশ তৈরি হয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কাছের শহর সিয়াটেলের উদ্দেশে।

আর আজকের প্রথম গন্তব্যই এমন এক জায়গা, যার নাম শুনলেই বাঙালির মন একটু নরম হয়ে যায়—একটি বাঙালি রেস্তরাঁ, নাম খাবার’

বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘খাবার’ খুঁজতে বেরিয়েছি—এ যেন একেবারে বাঙালির স্বভাবসিদ্ধ অভিযান! দেখি, সিয়াটেলের বুকে এই ‘খাবার’-এর স্বাদে কলকাতার কতটা ছোঁয়া পাওয়া যায়!

রেস্তরাঁয় ঢুকতেই কানে ভেসে এল বাংলা গান। মনে হল, বহু দূরের এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে হঠাৎ যেন নিজের ঘরের কাছাকাছি কোথাও এসে পড়েছি। রেস্তরাঁটির মালকিন একজন বাঙালি মহিলা। তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়ে বেশ ভালো লাগল।

আমরা যে কটি পদ খেলাম, প্রতিটিই ছিল বেশ সুস্বাদু। খাবারের স্বাদ যেমন ভালো লেগেছে, তেমনই রেস্তরাঁটির পরিবেশও ছিল বেশ মনোরম। অল্প সময়ের মধ্যেই জায়গাটির প্রতি একটা আপন অনুভূতি তৈরি হয়ে গেল।

খাওয়া-দাওয়া ও কিছুক্ষণ গল্পগুজবের পর সেখান থেকে আমরা চলে গেলাম Golden Gardens Beach-এর দিকে।

Golden Gardens Beach সিয়াটেলের Ballard এলাকার কাছে Puget Sound-এর তীরে অবস্থিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকত ও পার্ক। এখানকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল বালুকাবেলা, বিস্তৃত জলরাশি এবং দূরে Olympic Mountains-এর মনোরম দৃশ্য। পার্কটির মধ্যে রয়েছে হাঁটার পথ, picnic area, wetlands, volleyball court এবং বিশ্রাম ও আনন্দ করার নানা ব্যবস্থা। গ্রীষ্মকালে নির্দিষ্ট জায়গায় beach fire-এর ব্যবস্থাও থাকে।

বিশাল, সুন্দর সেই সৈকতটি দেখে মন ভরে গেল। চারদিকে প্রচুর মানুষের ভিড়। কেউ বালুকাবেলায় শুয়ে বা বসে অবসর কাটাচ্ছেন, কেউ জলের ধারে আনন্দ করছেন, আবার কেউ বা পরিবার-পরিজন নিয়ে picnic করতে এসেছেন। কেউ খেলাধুলায় ব্যস্ত, কেউ আবার নিঃশব্দে বসে জলরাশির দিকে তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছেন।

Puget Sound-এর নীল জলরাশি, বিস্তৃত বালুকাবেলা আর চারপাশের সবুজের মেলবন্ধন জায়গাটিকে যেন অন্যরকম সৌন্দর্য দিয়েছে। দূরে পাহাড়ের আবছা রেখা আর জলের ওপর দিয়ে চলা নৌকাগুলির দৃশ্যও বেশ উপভোগ করলাম। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি এখানে খুব শান্তভাবে নিজের সৌন্দর্য মেলে ধরেছে।

তবে এত মানুষের ভিড়ের মধ্যেও সবচেয়ে যে বিষয়টি আমাদের ভালো লেগেছে, তা হল এখানকার সুন্দর শৃঙ্খলা। কেউ কাউকে বিরক্ত করছেন না, নিজের আনন্দের সঙ্গে অন্যের আনন্দেরও যেন সমান মর্যাদা দিচ্ছেন সবাই। আর সবচেয়ে প্রশংসার বিষয়—এত মানুষের আনাগোনা সত্ত্বেও সবাই সৈকতটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছেন।

সমুদ্রের ধারে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে মনটা একেবারে ভরে গেল। বিদেশের মাটিতে নতুন নতুন দৃশ্য, নতুন অভিজ্ঞতা—তার মধ্যেও কিছু কিছু মুহূর্ত হঠাৎ খুব আপন হয়ে ওঠে। ‘খাবার’-এর বাংলা গান আর বাঙালির আতিথেয়তা থেকে শুরু করে Golden Gardens-এর নীল জল, বালুকাবেলা, দূরের পাহাড় আর মানুষের সুন্দর সহাবস্থান—দিনটা তাই আমাদের কাছে হয়ে রইল এক বিশেষ স্মৃতি।

সুন্দর সময় কাটিয়ে অবশেষে আমরা ফিরে এলাম বাড়িতে। সবে তিনদিন হল এসেছি, তাই শরীরের ক্লান্তি ছিল ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল আনন্দ আর নতুন অভিজ্ঞতার রেশ। মনে হল, আমাদের পথচলার শুরুটা বেশ সুন্দরভাবেই হচ্ছে।

Leave a comment