২০ আগস্ট ২০২৬। ভারতীয় সময় রাত দুটো। কলকাতা থেকে আমাদের দীর্ঘ যাত্রা শুরু।
গন্তব্য—দূর আমেরিকার সিয়াটেল, আমাদের ছোট ছেলের কাছে।
প্রথমে কলকাতা থেকে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক। থাইল্যান্ডের স্থানীয় সময় ভোর ছটা নাগাদ ব্যাংককে পৌঁছলাম। তারপর সেখান থেকে তাইওয়ানের তাইপে। একের পর এক ফ্লাইট, মাঝখানে লেওভার—সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা। অবশেষে ২০ আগস্ট সিয়াটেলের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে।আকাশে তখন যথেষ্ট আলো ।
গতবারের অভিজ্ঞতা অবশ্য মনে ছিল। দু’বার ফ্লাইট পরিবর্তন করে ফিনল্যান্ডে পৌঁছে দেখেছিলাম, আমাদের ব্যাগ দুটো আর আমাদের সঙ্গে পৌঁছয়নি! সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার ছেলেদের পরামর্শে আগেভাগেই আমাদের দুজনের সুটকেসে দুটো করে ট্র্যাকার রেখে দিয়েছিলাম। ফলে ছেলেরা দূরে বসেই সবসময় জানতে পারছিল আমাদের ব্যাগ ঠিক কোথায় আছে।
তবে এবারের যাত্রায় আর কোনও অঘটন ঘটেনি। সবকিছু এত সুন্দরভাবে, এত মসৃণভাবে হয়ে গেল যে মনে হলো—দীর্ঘ পথের ক্লান্তিটুকুও যেন ধীরে ধীরে গলে গেল।
আর সেই ক্লান্তি পুরোপুরি উধাও হয়ে গেল সিয়াটেল বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর মুহূর্তে।
চোখের সামনে ছোট ছেলেকে দেখতে পেলাম।
এক নিমেষে প্রায় তিরিশ ঘণ্টার যাত্রার ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেল! সন্তানকে চোখের সামনে পাওয়া—এর চেয়ে বড় আনন্দ বোধহয় আর কিছুই হতে পারে না।
ছেলের বাড়িতে পৌঁছে মনটা আরও ভালো হয়ে গেল। চারপাশে অজস্র গাছপালা, সবুজে ঘেরা এক শান্ত, বিশাল সুন্দর কমপ্লেক্স। শহরের ব্যস্ততার মধ্যেও যেন এখানে এক টুকরো প্রশান্তির জগৎ। মনে হলো, এত দূর পথ পেরিয়ে এসে সত্যিই যেন অন্য এক সুন্দর পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছি।
রাতের জন্য ছেলে আমাদের জন্য নিজের হাতে রান্না করে রেখেছিল। সারাদিনের ক্লান্তির পর ছেলের হাতের সুস্বাদু রান্না—সে স্বাদ শুধু পেটই ভরায় না, মনও ভরিয়ে দেয়। বিদেশের মাটিতে সন্তানের হাতে রান্না করা খাবারের মধ্যে যে ভালোবাসা মিশে থাকে, তার সঙ্গে কোনও রেস্তোরাঁর খাবারের তুলনা হয় না।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই জানলার বাইরে তাকিয়ে মনটা আরও ভালো হয়ে গেল। ঝকঝকে নীল আকাশ, ভোরের নরম রোদ আর চারপাশের সবুজে মোড়া বিশাল কমপ্লেক্স—মনে হচ্ছিল যেন কোনও স্বপ্নের মায়াপুরী।
এক বছর পর আবার আমরা এলাম আমাদের ছোট ছেলের কাছে, বেলেভিউতে।
সময় কত দ্রুত চলে যায়! অথচ এক বছর পর একই জায়গায় অবশ্য অন্য ঠিকানায় এসে মনে হলো, কিছু কিছু জায়গা শুধু জায়গা নয়—সেগুলো ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে যায়। আর সেই ভালোবাসার টানেই বারবার আসতে ইচ্ছে করে।
এই ভ্রমণে আরও একটি বিষয় খুব গভীরভাবে আমার নজরে পড়ল।
বিভিন্ন দেশের ফ্লাইটে দেখলাম, এয়ার হোস্টেস এবং বিমানবন্দরের কর্মীরা নিজেদের দেশের মানুষের সঙ্গে নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। আর বিদেশিদের সঙ্গে খুব স্বাভাবিকভাবেই ইংরেজিতে কথা বলেন। বিষয়টি আমার বেশ ভালো লেগেছে।
নিজের ভাষার প্রতি এই টানটা সত্যিই সুন্দর। ভাষা তো শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়—ভাষার মধ্যে মিশে থাকে নিজের মাটি, নিজের সংস্কৃতি, নিজের মানুষ এবং নিজের শিকড়ের গন্ধ।
তাই ভাবছিলাম, আমাদের দেশেও যদি আমরা নিজেদের মাতৃভাষাকে আরও বেশি ভালোবাসি, আরও গর্বের সঙ্গে ব্যবহার করি, তাহলে হয়তো আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটাও আরও গভীর হবে।
দেশের প্রতি ভালোবাসা হয়তো অনেক সময় বড় কোনও কথায় প্রকাশ পায় না। ছোট ছোট অভ্যাসের মধ্যেই তার প্রকাশ ঘটে—নিজের ভাষায় কথা বলা, নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করা, নিজের শিকড়কে মনে রাখা।
দীর্ঘ তিরিশ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে আমেরিকার মাটিতে এসে তাই শুধু ছেলের কাছে পৌঁছনোর আনন্দই পেলাম না, সঙ্গে পেলাম কিছু নতুন উপলব্ধিও।
দূরত্ব যতই হোক, পৃথিবী যতই বড় হোক—ভালোবাসার টান সব দূরত্বকে ছোট করে দেয়।
আর সন্তানের মুখটা চোখের সামনে একবার ভেসে উঠলেই—দীর্ঘ পথের সব ক্লান্তি সত্যিই এক নিমেষে উধাও হয়ে যায়।