নতুন কিছু শেখার আনন্দ – সুপ্রিয় রায়

সার্থকবাবুর বয়স সত্তর পেরিয়েছে। সাথী দেবীরও ষাটের কোঠা অনেক আগেই পেরিয়েছে। কিন্তু একটা ব্যাপারে দু’জনেরই মিল ছিল—তাঁরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের বয়স বাড়ে, শেখার বয়স নয়।

তবু কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবে মানা ততটা সহজ নয়।

একদিন বিকেলে চা খেতে খেতে সাথী দেবী বললেন,— জানো, আমি ভাবছি এবার মোবাইলে গান রেকর্ড করা শিখব।

সার্থকবাবু চমকে উঠলেন।

— এই বয়সে?

— কেন? গান গাইতে বয়স লাগে নাকি?

— না, তা লাগে না। তবে মোবাইল তোমাকে দেখে ভয় পেতে পারে!

— খুব ভালো। মোবাইল ভয় পেলে আমি সাহস পাব।

দু’জনেই হেসে ফেললেন।

পরদিন থেকেই শুরু হলো শেখার অভিযান।

সাথী দেবী ইউটিউব দেখে গান রেকর্ড করা শিখছেন।

কিন্তু প্রথম দিনেই বিপত্তি।

তিনি ভেবেছিলেন গান রেকর্ড হচ্ছে, পরে দেখা গেল ক্যামেরা চালু ছিল।

গানের বদলে রেকর্ড হয়েছে তাঁর মুখের নানা ভঙ্গি আর মাঝে মাঝে—

— আরে! এটা আবার কোথায় চাপলাম?

ভিডিও দেখে সার্থকবাবু এত হাসলেন যে চশমা খুলে চোখ মুছতে হলো।

— গানটা কম, রহস্যময় সিনেমা বেশি হয়েছে।

— খুব হাসছ? তুমি কী শিখছ?

সার্থকবাবু গলা খাঁকারি দিলেন।

— আমি কম্পিউটারে ভিডিও এডিটিংয়ের নতুন সফটওয়্যার শিখছি।

— কতদূর শিখলে?

— বেশ ভালোই।

ঠিক তখনই কম্পিউটারের স্ক্রিন কালো হয়ে গেল।

দেখা গেল তিন ঘণ্টার কাজ ভুল করে ডিলিট করে ফেলেছেন।

সাথী দেবী বললেন,— বাহ! তুমি তো শেখার আগেই বিদায় অনুষ্ঠান করে ফেলেছ।

এরপর শুরু হলো দু’জনের যৌথ শিক্ষাযাত্রা।

সকালে আধঘণ্টা গান রেকর্ডিং।

বিকেলে ভিডিও এডিটিং।

রাতে নতুন নতুন অ্যাপ শেখা।

কখনও ভুল হচ্ছে, কখনও সফল হচ্ছেন।

একদিন সার্থকবাবু গর্ব করে বললেন,— আজ আমি নিজেই ভিডিওতে সাবটাইটেল দিয়েছি।

সাথী দেবী ভিডিও দেখে বললেন,— খুব ভালো। তবে একটা সমস্যা আছে।

— কী?

— আমি গান গাইছি “আমার হিয়ার মাঝে”, আর সাবটাইটেলে লিখেছে “আমার ইয়ার মাঝে”।

— ওটা প্রযুক্তির ভুল।

— না, ওটা তোমার ইংরেজি আর বাংলার বন্ধুত্ব।

দু’জনেই আবার হেসে উঠলেন।

কয়েক মাস পরে স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁদের ডাকা হলো।

সার্থকবাবুর ও সাথী দেবী তাদের তৈরি করা শ্রুতিনাটক পরিবেশন করলেন এবং সেটা রেকর্ডও করলেন ।

অনুষ্ঠান শেষে এক কলেজপড়ুয়া ছেলে এসে বলল,— কাকু, কাকিমা, আপনাদের দেখে খুব অনুপ্রাণিত হলাম।

সার্থকবাবু অবাক।

— কেন?

— আমরা অনেক সময় ভাবি, নতুন কিছু শেখার জন্য এখন সময় নেই। আর আপনারা এই বয়সেও এত কিছু শিখছেন।

সাথী দেবী মৃদু হেসে বললেন,— শেখার জন্য সময় বের করতে হয়, সময় পাওয়া যায় না।

ছেলেটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে সার্থকবাবু বললেন,— জানো সাথী, ছোটবেলায় ভাবতাম বয়স বাড়লে মানুষ সব জেনে যায়।

— আর এখন?

— এখন বুঝি, যত বয়স বাড়ে তত বোঝা যায় কত কিছু এখনও শেখা বাকি।

সাথী দেবী হেসে বললেন,— সেই জন্যই জীবনটা এত মজার।

— ঠিক বলেছ। যে দিন মানুষ শেখা বন্ধ করে দেয়, সে দিন থেকেই তার বয়স সত্যিই বাড়তে শুরু করে।

সন্ধ্যার আকাশে তখন লালচে আলো।

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটছিলেন।

পা দুটো আগের মতো দ্রুত নয়, কিন্তু কৌতূহলটা এখনও তরুণ।

কারণ তাঁরা শিখে গিয়েছেন—

জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, নতুন কিছু শেখার আনন্দের কোনো বয়সসীমা নেই।

স্কুলের ক্লাসরুম ছেড়ে মানুষ বেরিয়ে আসে, কিন্তু শেখার ক্লাসরুম থেকে কখনও বেরোয় না। আর যে মানুষ কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সে মানুষ বয়সে বৃদ্ধ হলেও মনে চিরতরুণ থেকে যায়।

Leave a comment