সন্ধ্যা নামতেই সার্থকের যেন অস্থিরতা শুরু হয়। ঘড়ির কাঁটা ছ’টা ছুঁলেই তার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি কাজটি এখনই করতে হবে—পাড়ার মোড়ে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া।
” চারটা চা দে!”
বিমলের চায়ের দোকানে এই কথাটাই যেন সন্ধ্যার জাতীয় সঙ্গীত। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই দোকানের সামনে বেঞ্চগুলো একে একে ভরে ওঠে। ধোঁয়া ওঠা মাটির ভাঁড়, বিস্কুটের কৌটো, আর অকারণ হাসির শব্দে জমে ওঠে পাড়ার আড্ডা।
সার্থকও রোজ আসে। সেদিন শার্টটা গায়ে চাপিয়ে দরজার দিকে এগোতেই স্ত্রী সাথী বলল,— কোথায় চললে?
সার্থক খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,— একটু আড্ডা দিয়ে আসি।
সাথী হাসল।
— তোমাদের “একটু” কথাটা অভিধানে নতুন করে লেখা উচিত। সন্ধ্যা সাতটায় বেরিয়ে রাত দশটায় ফিরে বলো, “এই তো, একটু বসেছিলাম!”
সার্থকও হেসে বলল,— আড্ডা না দিলে জীবনটা শুকিয়ে যায়। মানুষ কি শুধু ভাত খেয়ে বাঁচে? একটু আড্ডাও লাগে।
— তাই নাকি? আচ্ছা বলো তো, গতকালের তিন ঘণ্টার আড্ডায় কী এমন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছিল?
সার্থক একটু ভেবে বলল,— উঁ… কে নতুন গাড়ি কিনেছে, কার ছেলে বিদেশে গেল, কার বউ কার সঙ্গে ঝগড়া করল…
সাথী হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলল — বুঝেছি। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি বেঁচে গেল, বিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার হয়ে গেল, আর মানবজাতির সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল!
দুজনেই হেসে উঠল।
সাথী একটু গম্ভীর হয়ে বলল,— জানো, আমি কিন্তু আড্ডার বিরোধী নই।আমি বিশ্বাস করি, আড্ডা মানুষের মানসিক চাপ কমায়। হাসায়। সম্পর্ক ভালো করে। কিন্তু আড্ডা যদি অপমান, গুজব আর বিদ্বেষে ভরে যায়, তাহলে সেটা বিষ হয়ে যায়। সেই আড্ডার মূল্য কতটুকু?
– ঠিক বলেছ। আড্ডা এমন হওয়া উচিত, যেখানে কেউ উঠে গিয়ে বলবে— “আজকের সময়টা সত্যিই ভালো কাটল।” আর কেউ যেন না বলে— “আজ আমাকে নিয়েই সবাই হাসল।”
সাথী উৎসাহ পেয়ে বলতে লাগলো – আড্ডা মারার কত ভাল ভাল বিষয় আছে , কিছু শেখার আড্ডাও তো হতে পারে বা সবাই মিলে কোন পরিকল্পনা করা ।
– আর ফুটবল?
– অবশ্যই। তবে ফুটবল নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে বন্ধুত্ব যেন অফসাইডে না যায়!
সার্থক এবার চুপ করে গেল।
সত্যিই তো! গত কয়েক মাসে সে কত সন্ধ্যা আড্ডায় কাটিয়েছে, কিন্তু বাড়ি ফিরে এমন কী এনেছে, যা পরিবারকে দিয়েছে? নতুন কোনো ভাবনা? কোনো ভালো উদ্যোগ? কোনো অনুপ্রেরণা?
মনে পড়ল, ছোটবেলায় বাবা বলতেন, “যে পাঁচজন মানুষের সঙ্গে তুমি সবচেয়ে বেশি সময় কাটাও, ধীরে ধীরে তুমিও তাদের মতো হয়ে ওঠো।”
পরদিন সন্ধ্যায় আবার আড্ডা বসল। রাতে বাড়ি ফিরে সার্থকের মুখে এক অন্যরকম হাসি।
সাথী জিজ্ঞেস করল,— কী ব্যাপার? আজ এত তাড়াতাড়ি?
সার্থক হেসে বলল,— আজ সত্যিই আড্ডা দিয়ে এলাম।
— মানে?
— আজ আমাদের আড্ডায় কারও বদনাম করা হয়নি । বরং সবাই মিলে হাসি, মজা আর কতকিছু বিষয় নিয়ে কথা বলেছি । আজ মনে হোল, আড্ডা সময় নষ্ট করে না, মানুষই কখনও কখনও আড্ডাকে সময় নষ্টের জায়গা বানিয়ে ফেলে।
সাথী বলল,— এই আড্ডার জন্য আমি রোজ চা বানাতে রাজি।
সার্থক হেসে উত্তর দিল,— তাহলে ঠিক হলো, আড্ডা হবে। তবে এমন আড্ডা, যেখান থেকে ফিরে মানুষ একটু ভালো মানুষ হয়ে ওঠে।
জানলার বাইরে বাতাস বইছিল। দূরে মোড়ের চায়ের দোকানে এখনও আড্ডা চলছে। কোথাও হয়তো শুধু অন্যের সমালোচনা, আবার কোথাও হয়তো জন্ম নিচ্ছে নতুন কোনো স্বপ্ন।
আড্ডা কখনও খারাপ নয়। খারাপ হয় আড্ডার বিষয়।আর সেই বিষয়ই ঠিক করে দেয়, আড্ডা আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করবে, নাকি শুধু সময়টাকে নষ্ট করবে ।