বারান্দার শেষ ধোঁয়া – সুপ্রিয় রায়

বারান্দায় বসে আছেন সার্থকবাবু। এক হাতে চায়ের কাপ, অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এমন ভাব করছেন, যেন পৃথিবীর সব চিন্তার সমাধান ওই ধোঁয়ার সঙ্গেই উড়ে যাচ্ছে। আর পাশে রাখা চশমা, টেবিলে ডায়াবেটিস, প্রেসার আর শ্বাসকষ্টের ওষুধ।

ঠিক তখনই স্ত্রী সাথী এসে পাশে বসে হালকা হেসে বললেন,-
— ওষুধগুলো তো ঠিক সময়ে খাচ্ছো , আর সিগারেটটাও ঠিক সময়ে ধরাচ্ছো দেখছি ! তাহলে বেশ নিয়ম মেনেই চলছো , বল ।কিন্তু ডাক্তার তো স্পষ্ট বলেছিলেন—ডায়াবেটিস, প্রেসার, শ্বাসকষ্ট… এর মধ্যে আর সিগারেট নয়।”

সার্থকবাবু মুচকি হেসে বললেন,— এই বয়সে আর ছেড়ে কী হবে? এত বছর তো খেয়েই কাটালাম।

সাথী শান্ত গলায় বললেন,— এই বয়সেই তো ছাড়া সবচেয়ে দরকার। এখন অসুস্থ হলে কষ্টটা শুধু তোমার হবে না, আমারও হবে।

সার্থকবাবু নির্বিকার।
— আরে, একটা সিগারেট খেলে কিছু হয় না।

সাথী হেসে বললেন,— ঠিকই বলেছ। একটা সিগারেট কিছু করে না। কিন্তু দিনে যে দশ-বারোটা খাও, সেগুলো কি একটাই?

সার্থকবাবু গম্ভীর মুখে বললেন,— দিনে দশটার নিচে সিগারেট খেলে আবার তাকে স্মোকার বলে নাকি?

সাথী হেসে ফেললেন।
— তা হলে চোর যদি বলে, ‘আমি তো দিনে মাত্র একটা চুরি করি’, তাকে কি সাধু বলা হবে?

সার্থকবাবু একটু চুপ। তারপর হালকা মজা করে বললেন,— আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করো নাকি?

সাথী হেসে উত্তর দিলেন,— এত বছর ধরে সংসার করেছি। এখন চিন্তা না করলে আর কবে করব?

কিছুক্ষণ নীরবতা।

সার্থকবাবু আবার বললেন,— আমি চাইলে আজই সিগারেট ছেড়ে দিতে পারি।

সাথী হেসে বললেন,— এই কথাটা শুনতে শুনতে আমার চুল কালো থেকে সাদা হয়ে গেল। শুধু ‘আজ’টা কোনোদিন আসে না, সব সময় ‘কাল’ হয়ে থাকে।

দুজনেই হেসে উঠলেন।

সাথী ঘরের ভেতরে গিয়ে একটা অ্যালবাম নিয়ে এলেন। অ্যালবাম থেকে  ছবি খুলে স্বামীর সামনে ধরলেন।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে— ছেলে , মেয়ে , জামাইকে নিয়ে কিছুদিন আগের থাইল্যান্ড সফরের সুন্দর আনন্দের কিছু মুহূর্ত ।

ছবি দেখে সার্থকবাবুর চোখ স্থির হয়ে গেল।

তারপর সাথী ধীরে ধীরে বললেন,— জানো, এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই। শুধু চাই, সব সন্তানদের সাথে  আমরা সুস্থ থাকি ও আনন্দে থাকি । তাহলে ওরাও সব সময় আমাদের জন্য চিন্তামুক্ত হয়ে ভাল থাকবে । আর মনে প্রাণে কি চাই জানো –  সকাল – বিকেলের চা-টা আমরা দু’জনে একসঙ্গে আরও অনেক দিন খেতে পারি। শুধু ভয় হয় সিগারেটটা যেন আমাকে তোমার আগেই একা করে না দেয়।

কথাটা শুনে সার্থকবাবু চুপ হয়ে গেলেন।

সাথী বলতে থাকলো – সুস্থ না থাকলে নাতি , নাতনির সাথে খেলবে কি করে ?

সার্থকবাবুর  হাতে ধরা সিগারেটটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন । তারপর ধীরে ধীরে সেটি নিভিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিলেন।

তারপর হেসে বললেন,— এতদিন ভাবতাম আমি সিগারেট খাচ্ছি। আজ বুঝলাম, আসলে সিগারেটই আমাকে খাচ্ছিল।

সাথী হাসলেন।

— আজ সত্যিই একটা ভালো টান দিলে।

সার্থকবাবু অবাক হয়ে বললেন,— কোথায়?

সাথী স্বামীর হাতটা ধরে বললেন,— সিগারেটে নয়… জীবনের দিকে।

দু’জনেই হেসে উঠলেন।

সন্ধ্যায় আবার চা হলো, গল্প হলো, হাসি হলো…

শুধু ধোঁয়াটা আর ফিরে এল না।

পরিশেষে বলতে হয় –

সিগারেটের ধোঁয়া কয়েক সেকেন্ডেই মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার ক্ষতি অনেক বছর থেকে যায়।আপনি যদি আপনার পরিবারের কাছে সত্যিই মূল্যবান হন, তাহলে আজই ধূমপান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিন। কারণ আপনার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক প্রিয় মানুষের হাসি।

Leave a comment