বড় শহরের একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। শহর আপনাকে কাজ দেবে, যানজট দেবে, ধোঁয়া দেবে, কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁইটা নিজের জোগাড় করে নিতে হবে। তাই যারা ছোট শহর বা গ্রামের মানুষ, তারা বছরের অনেকটা সময় কাজের সূত্রে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু কিংবা অন্য বড় শহরে কাটাতে কাটাতে একসময় ভাবেন—”আর কত হোটেলের ভাড়া দেব? তার চেয়ে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনি।” তারপর শুরু হয় EMI, রেজিস্ট্রি, ইন্টেরিয়র, ইলেকট্রিক মিটার, জল সংযোগ—সবকিছুর সঙ্গে যুদ্ধ।
সব যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও কিন্তু বাড়িতে ঢোকা যাবে না।
কারণ, বাড়ি এখনও “অফিসিয়ালি” মানুষ থাকার উপযুক্ত হয়নি।
আগে গৃহপ্রবেশ হবে।
পুরোহিতমশাই আসবেন, ধূপ জ্বলবে, ঘণ্টা বাজবে, দুধ ফুটবে, কলাগাছ দাঁড়াবে, আত্মীয়স্বজন বলবেন, “বাহ! খুব সুন্দর হয়েছে।”
তারপর বাড়ি যেন সরকারি সিলমোহর পেয়ে যায়—এবার মানুষ থাকতে পারবে।
এ যেন বাড়িরও আত্মসম্মানের প্রশ্ন! বাড়ি যেন বলছে, “এই যে শুনছেন, আমাকে কিনে ফেললেই হবে না। আগে একটু সম্মান করে ঢুকুন, তারপর যত খুশি থাকুন।”
কিন্তু একই মানুষ যদি পাশের পাড়ায় পাঁচ বছরের জন্য একটা ভাড়া বাড়ি নেন, তখন দৃশ্যটা সম্পূর্ণ আলাদা।
সকাল দশটায় বাড়িওয়ালা চাবি দিলেন।
দশটা পাঁচে খাট ঢুকল।
দশটা দশে গ্যাস সিলিন্ডার।
দশটা পনেরোয় প্রেসার কুকারের সিটি।
এগারোটায় বাড়ির সবাই এমনভাবে বসবাস শুরু করে দিলেন, যেন তাঁরা এখানেই গত তিন পুরুষ ধরে আছেন।
ভাবুন তো, যদি ভাড়া বাড়িরও অনুভূতি থাকত! সে হয়তো অভিমান করে বলত, “আমার দোষটা কী? আমি কি ইট-সিমেন্টে কম নাকি? আমার দরজায় একটা আলপনা, দুটো ফুল আর একবাটি পায়েসও জুটল না!”
আসলে এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণও আছে। নিজের বাড়ি মানে দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয়, নিজের সম্পত্তি, পরিবারের ভবিষ্যৎ। তাই বহু মানুষ ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক রীতি মেনে গৃহপ্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য একটাই—নতুন ঘরে শুভ সূচনা হোক, সংসারে শান্তি আসুক। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে এই রীতির ধরন আলাদা হতে পারে, আবার কেউ একেবারেই পালন করেন না। এটি মূলত ব্যক্তিগত বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কারের বিষয়।
অন্যদিকে ভাড়া বাড়ি হলো অনেকটা ট্রেনের রিজার্ভ সিটের মতো। যত্ন করে ব্যবহার করবেন, কিন্তু জানেন যে একদিন উঠে যেতেই হবে। তাই সেখানে “শুভ উদ্বোধন” করার চেয়ে “গ্যাসের সংযোগ কবে হবে” আর “ওয়াই-ফাই লাগবে কবে”—এই প্রশ্নগুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা দাঁড়ায় বিশ্বাস আর প্রয়োজনের মেলবন্ধনে। নিজের বাড়িতে মানুষ শুধু থাকেন না, স্বপ্নও রাখেন। তাই সেখানে গৃহপ্রবেশের আয়োজন। আর ভাড়া বাড়িতে মানুষ মূলত সময় কাটান—তাই সেখানে গৃহে প্রবেশই যথেষ্ট। একটিতে থাকে স্থায়িত্বের আশা, অন্যটিতে থাকে চুক্তির মেয়াদ। তবে ইট, বালি আর সিমেন্টের দিক থেকে দেখলে—দুই বাড়িই নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছে, “আমাদের মধ্যে এত ভেদাভেদ কেন?”
Krishna Kumar Ganguly
Bhalo laglo
LikeLike