অবসর নেওয়ার পর সার্থকবাবু আর তাঁর স্ত্রী সাথীদেবী ঠিক করলেন, “এবার জীবনটা একটু অন্যভাবে উপভোগ করা যাক।”
সার্থকবাবু বললেন,— সারাজীবন চাকরি করলাম। এখন সময় আছে, অভিজ্ঞতা আছে। চল, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু ভাল ভাল কনটেন্ট বানাই।
সাথীদেবীও উৎসাহিত হলেন।
— হ্যাঁ, সমাজের উপকার হয় এমন কিছু পোস্ট করব। মানুষকে সচেতন করব।
দু’জনে মিলে ইউ টিউবে একটি চ্যানেল খুললেন। কখনও শরীর স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় , কখনও পরিবেশ রক্ষার কথা, কখনও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বার্তা, কখনও বয়স্ক মানুষের সমস্যা নিয়ে ভিডিও বানিয়ে পোস্ট করতে লাগলেন।
প্রথম ভিডিওতে ভিউস হলো ৩২।
দ্বিতীয়টাতে ৫৭।
তৃতীয়টাতে ৮৯।
সার্থকবাবু আনন্দে বললেন,— দেখো, উন্নতি হচ্ছে!
সাথীদেবী মুখ গম্ভীর করে বললেন,— উন্নতি হচ্ছে? পাশের বাড়ির টিংকু আজকে শুধু “আমার বিড়াল হাঁচি দিল” ভিডিও পোস্ট করে ৫০ হাজার ভিউস পেয়েছে!
সার্থকবাবু চুপ।
পরদিন দেখলেন একজন শুধু নাচছে, লাখ লাখ ভিউস।
আরেকজন শুধু খাবার খাচ্ছে, কোটি ভিউস।
সার্থকবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— সাথী, আমরা কি কিছু ভুল করছি?
সাথীদেবী বললেন,— তাহলে কি আমরাও একটা বিড়াল কিনব?
— কেন?
— ওকে হাঁচি দেওয়ার ট্রেনিং দেব!
দু’জনেই হেসে ফেললেন।
কিন্তু মনের প্রশ্নটা থেকেই গেল।
একদিন বিকেলে পার্কে বসে তাঁরা এই নিয়েই আলোচনা করছিলেন।
সার্থকবাবু বললেন,— ভাল কনটেন্ট বলতে আসলে কী? যে কনটেন্টে লাখ লাখ ভিউস হয়?
সাথীদেবী বললেন,— নাকি যে কনটেন্ট মানুষকে কিছু শেখায়?
ঠিক তখনই পাশের বেঞ্চে বসা এক বৃদ্ধ তাঁদের কথোপকথন শুনে হেসে বললেন,— আপনাদের একটা গল্প বলি?
দু’জনেই আগ্রহী হয়ে তাকালেন।
বৃদ্ধ বললেন,— একটা মিষ্টির দোকানে প্রতিদিন হাজার লোক আসে। আর পাশের লাইব্রেরিতে আসে দশজন। তাহলে কি মিষ্টির দোকান বইয়ের চেয়ে বেশি মূল্যবান?
সার্থকবাবু বললেন,— তা তো নয়।
— কারণ মিষ্টি সবাই খেতে ভালবাসে, কিন্তু বই সবাই পড়ে না। তবু বইয়ের প্রয়োজন কমে যায় না।
বৃদ্ধ আবার বললেন,— ভিউস আর লাইক অনেক কারণে হয় । সেটা কখনই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নয় বা মূল্যবোধ মাপার মাপকাঠিও হতে পারে না।
কথাটা শুনে দু’জনেই একটু চুপ করে গেলেন।
বাড়ি ফিরে সার্থকবাবু আবার তাঁদের চ্যানেলের কমেন্টগুলো পড়তে লাগলেন।
হঠাৎ একটি মন্তব্য চোখে পড়ল।
“আপনাদের কুসংস্কারবিরোধী ভিডিও দেখে আমি আমার মেয়েকে বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিতে উৎসাহ দিয়েছি।”
আরেকটি মন্তব্য।
“বয়স্কদের নিয়ে ভিডিওটি দেখে বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা নতুন করে ভাবতে শিখেছি।”
আরেকজন লিখেছে।
“আপনাদের ভিডিও খুব বেশি মানুষ দেখে না, কিন্তু আমি নিয়মিত দেখি।”
সাথীদেবী চোখ ভিজে উঠল।
— দেখেছ? আমরা ভাবছিলাম কেউ দেখছে না।
সার্থকবাবু মৃদু হেসে বললেন,— হয়তো আমরা লাখ লোককে পৌঁছতে পারিনি। কিন্তু কয়েকজনের মনে পৌঁছতে পেরেছি।
সেই দিন থেকে তাঁরা আর ভিউস গুনতেন না।
তবে মানুষ তো! মাঝেমধ্যে কৌতূহল হতোই।
একদিন সাথীদেবী মজা করে বললেন,— যদি কখনও আমাদের ভিডিওতে এক মিলিয়ন ভিউস হয়?
সার্থকবাবু বললেন,— তাহলে খুশি হব।
— আর যদি না হয়?
— তাহলেও খুশি হব।
— কেন?
— কারণ এখন বুঝেছি, সব জনপ্রিয় কনটেন্ট ভাল কনটেন্ট নয়, আবার সব ভাল কনটেন্ট জনপ্রিয়ও হয় না।
সাথীদেবী হেসে বললেন,— তাহলে ভাল কনটেন্ট বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? যে কনটেন্টে লাখ লাখ ভিউস হয়?নাকি যে কনটেন্ট আমাদের রুচি গড়ে তোলে?নাকি যে কনটেন্ট সমাজে সচেতনতা ছড়ায়?
সার্থকবাবু একটু ভেবে বললেন,— যে কনটেন্ট মানুষকে কয়েক সেকেন্ডের আনন্দ দেয়, সেটা ভাল হতে পারে। যে কনটেন্ট মানুষকে কিছু শেখায়, সেটাও ভাল হতে পারে। আর যে কনটেন্ট মানুষের চিন্তাভাবনাকে একটু হলেও ইতিবাচকভাবে বদলে দেয়, সেটা সবচেয়ে মূল্যবান।
সাথীদেবী বললেন,— অর্থাৎ ভিউস সংখ্যা বলে কতজন দেখল, কিন্তু কনটেন্টের গুণ বলে কতজন বদলাল।
সার্থকবাবু হেসে বললেন,— একদম ঠিক। লাখ ভিউস পাওয়া সহজ হতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের জীবনকে একটু ভাল দিকে বদলে দেওয়া অনেক বড় ব্যাপার।
সেদিন রাতে তাঁরা আবার নতুন একটি সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করলেন।
ভিডিওর শেষে একটি লাইন লিখলেন—
“সবচেয়ে ভাল কনটেন্ট সেটাই, যা একদিকে আকর্ষণীয়, আবার অন্যদিকে সুস্থ সংস্কৃতির বাহক এবং সমাজকে শিক্ষা দেয়— সেটাই হয় প্রকৃত অর্থে সেরা কনটেন্ট।