কোটা ব্যবস্থা: সামাজিক ন্যায়বিচার, নাকি যোগ্যতার পথে ব্যারিকেড?- সুপ্রিয় রায়

কোটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলেই আমাদের যুক্তি সাধারণত দু’টি দলে ভাগ হয়ে যায়। একদল বলে, “সব কোটা তুলে দাও—শুধু merit!” অন্যদল বলে, “কোটা তুলে দিলে সামাজিক ন্যায়বিচার কোথায়?”

মাঝখানে দাঁড়িয়ে যুক্তি বেচারা তখন ভাবতে থাকে—আমার কথাটাও কেউ শুনবে?”

বাস্তবতা হলো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা কোনও অযৌক্তিক ধারণা থেকে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার ইতিহাস। তাই এক লহমায় পুরো ব্যবস্থাকে “যোগ্যতার শত্রু” বলে বাতিল করে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই এটাকে এমন এক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা উচিত নয়, যার মেয়াদ অনন্তকাল।

কারণ সময় বদলায়। সমাজ বদলায়। সুযোগের ক্ষেত্র বদলায়। নীতিরও বদলানো উচিত।

আজকের ভারত অনেকটাই বদলেছে। শিক্ষার সুযোগ বেড়েছে, প্রযুক্তি গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে, প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য—সবাই একই starting point থেকে দৌড় শুরু করে না। কেউ ভালো স্কুল, coaching, guidance এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে দৌড়ায়; কেউ হয়তো দৌড় শুরুর আগেই জুতোর ফিতা খুঁজতে ব্যস্ত!

তাই শুধু “merit” বললেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। কারণ merit তৈরি হওয়ার পেছনেও সুযোগের বড় ভূমিকা আছে।

কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উঠে আসে—যদি রাষ্ট্র সত্যিই পিছিয়ে থাকা মানুষকে এগিয়ে আনতে চায়, তাহলে সাহায্যটা কি সবসময় selection-এর শেষ ধাপে দিতে হবে?

নাকি শুরুতেই এমন ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে একজন দরিদ্র বা পিছিয়ে থাকা ছাত্র বা ছাত্রী ভালো সরকারি স্কুল পায়, দক্ষ শিক্ষক পায়, scholarship পায়, career counselling পায়, প্রয়োজন হলে coaching ও skill development-এর সুযোগ পায়?

আমার মনে হয়, দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় পথটাই বেশি কার্যকর।

কারণ শেষ মুহূর্তে quota দিয়ে প্রতিযোগিতার ফল বদলানোর চেয়ে, শুরুতেই সবার দৌড়ের পথটা সমান করার চেষ্টা অনেক বেশি টেকসই।

আরেকটি বিষয়ও উপেক্ষা করা যায় না। আজ এমন অনেক পরিবার আছে যারা তথাকথিত “উচ্চবর্ণ” হয়েও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, আবার এমন অনেক পরিবারও আছে যারা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে। ফলে সংরক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে creamy layer, প্রকৃত পিছিয়ে পড়া মানুষ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

তাহলে কি reservation একেবারে তুলে দেওয়া উচিত?

আমার উত্তর—না, এত সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না

বরং প্রয়োজন সংরক্ষণ ব্যবস্থার নিয়মিত মূল্যায়ন, কঠোর creamy layer, প্রকৃতভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অগ্রাধিকার এবং ধাপে ধাপে একটি আরও merit-oriented ও opportunity-based ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

কারণ সামাজিক ন্যায়বিচার এবং merit—এরা একে অপরের শত্রু হওয়ার কথা নয়। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমবে এবং প্রকৃত merit-এর সুযোগ ধীরে ধীরে বাড়বে।

শেষ পর্যন্ত আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ভারত, যেখানে কোনও শিশুর ভবিষ্যৎ তার জন্মপরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হবে না; আবার তার জন্মের কারণে সে যে অসুবিধা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে, সেটাকেও রাষ্ট্র অস্বীকার করবে না। মানুষের ভবিষ্যৎ তার জন্মপরিচয় দিয়ে নয়, বরং তার পরিশ্রম, দক্ষতা ও সম্ভাবনা দিয়ে নির্ধারিত হবে।

প্রশ্নটা শুধু—আমরা কি সেই ভারতের দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি, নাকি quota বনাম merit-এর একই পুরনো তর্কে ঘুরপাক খাচ্ছি ?

15 thoughts on “কোটা ব্যবস্থা: সামাজিক ন্যায়বিচার, নাকি যোগ্যতার পথে ব্যারিকেড?- সুপ্রিয় রায়

  1. Pranab Banerjee

     Right . Merit is the point which a state should concentrate and give importance. This merit is to be identified, nurtured in case of the beginners from the remotest villages as well as cities/ towns so that the children irrespective of caste and creed from the very begining acquire the power and strength of mind in case of competition in the higher level.

    Like

  2. Dalia Deb 

    চিন্তাশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবসম্মত লেখনী ….মূল্যায়নের চিরাচরিত ধারায় অনবদ্য….👌👌

    Like

Leave a comment