রবিবার সকাল।
সাথী চা বানিয়ে স্বামী সার্থকের সামনে রাখল। সার্থক খবরের কাগজ পড়তে পড়তে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। দাঁত দিয়ে এমন মনোযোগ দিয়ে নখ কাটছে যেন বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলছে।
সাথী বিরক্ত হয়ে বলল,— “তুমি কি মানুষ, না সুইস আর্মি নাইফ? সব কাজ দাঁত দিয়েই করবে নাকি?”
সার্থক হেসে বলল,— “এতে আবার কী হয়েছে?”
সাথী বলল,— “কিছু হয়নি, শুধু কাল তোমার নখের টুকরোটা চায়ের কাপের পাশে পেয়েছিলাম!”
সার্থক চুপ।
কিছুক্ষণ পর তারা দুজনে ট্রেনে করে শ্বশুরবাড়ি রওনা হোল ।
সার্থক মোবাইল বের করে ফুল ভলিউমে গান চালিয়ে দিল।
“ও টুনির মা…”
পুরো কামরার লোক চমকে উঠল।
একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বললেন,— “বাবা, হেডফোন বলে একটা জিনিস আছে না ?”
সার্থক বলল,— “গান ভালো লাগলে সবাই শুনুক। গান যদি সবাই না শোনে, তাহলে গান বাজানোর মজাটাই বা কোথায়?”
সাথী ফিসফিস করে বলল,— “তাহলে তোমার অফিসের বেতনটাও মাইকে বলে দাও, সবাই জানুক!”
কামরার লোকজন হাসি চেপে রাখল।
এরপর সাথীর ফোন এল।
সে এমন জোরে কথা বলতে শুরু করল যে তিন সারি দূরের যাত্রীরাও জানতে পারল—
তার মাসির হাঁটুর ব্যথা কমেছে,
পাড়ার রিন্টুর বিয়ে ঠিক হয়েছে,
আর বাজারে পটলের দাম কত!
সার্থক বলল,— “আস্তে কথা বলো!”
সাথী বলল,— “তুমি গান চালাবে, আর আমি আস্তে কথা বলব?”
সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক হেসে আবার বললেন,— ” মা , তোমার ফোনটা স্পিকারে নেই, কিন্তু তুমি নিজেই স্পিকার হয়ে গেছ । বাহ! খুব ভাল তোমরা দুজনেই সমাজসেবায় নেমেছো দেখছি!”
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল।
স্টেশনে নেমে তারা স্টেশনের পাশ থেকে অটো ধরল শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য ।
ট্রেনের মধ্যে যে চিপসের প্যাকেট থেকে তারা চিপস খাচ্ছিল , সেটা অটোতে একটু যেতেই খালি হয়ে গেল । সার্থক চিপসের প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে দিল।
আর সাথী পান খাচ্ছিল । অটোতে যেতে যেতে মাঝে মাঝেই মুখ বেড় করে রাস্তায় থুথু ফেলছিল ।
অটোর ভিতর মার পাশে বসে থাকা ছোট্ট একটা ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে তাদের দেখছিল ।
সে হটাৎ তার মাকে জিজ্ঞেস করল,— “মা, স্কুলে তো স্যার বলেন রাস্তা নোংরা করা খারাপ। তাহলে বড়রা করছে কেন? আমরা ছোটরা কি বড়দের কাছ থেকেই ভালো অভ্যাস শিখি না? তাহলে বড়রা যদি রাস্তা নোংরা করে, আমরা কাদের দেখে শিখব?”
প্রশ্নটা শুনে সার্থক আর সাথী দুজনেই একটু থমকে গেল।
ছেলেটার মা বললেন,— “বাবা, সবাই বড় হলেই শিক্ষিত হয় না। কিছু মানুষের এখনও শেখার বাকি । অনেকেই ভাবে এগুলো ছোটখাটো ব্যাপার। কিন্তু ভাবো তো, যদি একই কাজ অনেক মানুষ করে।”
কথাটা সোজা গিয়ে লাগল দুজনের মনে।
বাড়ি ফিরে সার্থক নেল কাটার বের করল।
সাথী একটা ছোট পলিথিন ব্যাগ রাখল আবর্জনা ফেলার জন্য।
সার্থক হেডফোন কিনল।
সাথী ফোনে আস্তে কথা বলা শুরু করল।
সেদিন রাতে সাথী হেসে বলল,— “জানো, আমরা দুজনেই ভাবতাম বদ অভ্যাস শুধু নিজের ব্যাপার।”
সার্থক বলল,— “আসলে না। আমাদের ছোট ছোট অভ্যাসই অন্যদের শান্তি নষ্ট করে, আর সমাজের বাজে চেহারা গড়ে।”
দুজনেই হাসল।
কারণ তারা বুঝে গেছে—”ভালো স্বামী-স্ত্রী হওয়া শুধু একে অপরকে ভালোবাসা নয়, সমাজের প্রতিও দায়িত্বশীল হওয়া।”