একটি ছোট্ট শিশুর চিৎকার… আর আমাদের বদলে যাওয়া মন – সুপ্রিয় রায়

গত শনিবারের কথা।

শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা আসার জন্য আমরা দু’জনে উঠেছিলাম বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে। সময় তখন দুপুর তিনটে। এনজেপি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বেশ গরম লাগছিল । তাই ট্রেন ছাড়ার প্রায় আধ ঘণ্টা আগে দরজা খুলতেই আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম ট্রেনে। মনে হচ্ছিল, একটু ঠাণ্ডা হাওয়া আর আরামদায়ক পরিবেশে শরীরটা যেন জুড়িয়ে যায়।

নির্দিষ্ট সময়েই ট্রেন ছেড়ে দিল।

আমরা দুপুরের খাবার বাড়ি থেকেই খেয়ে এসেছিলাম। তাই ট্রেন চলতে শুরু করতেই চারপাশের ঠাণ্ডা আরামদায়ক পরিবেশে দু’জনেরই চোখের পাতা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এল। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, নিজেরাই বুঝতে পারিনি।

হঠাৎ—একটা শিশুর তীব্র চিৎকারে আমাদের দু’জনেরই ঘুম ভেঙে গেল।

চোখ মেলে দেখি, আমাদের ঠিক পিছনের সিটে যে পরিবারটি বসেছিল, শিশুটি তাদেরই। ছোট্ট একটা ছেলে। অনবরত জোরে জোরে আওয়াজ করে চিৎকার করছিল ।

সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের বেশ বিরক্তই লাগছিল।

আমরা মিষ্টি করে বাচ্চাটিকে বললাম,— “এত জোরে চিৎকার কোরো না বাবা। তোমার গলা ব্যথা করবে, আর আমাদের মাথাটাও ধরে যাবে।”

ছোট্ট ছেলেটি আমাদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনল। মনে হল, বুঝতে পেরেছে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম, সে আমাদের কথা এক কান দিয়ে শুনেছে, আর অন্য কান দিয়ে বের করে দিয়েছে!আবার শুরু হল তার জোরে জোরে আওয়াজ করা ।

চারপাশটা যেহেতু সম্পূর্ণ বন্ধ কামরা, তাই সেই আওয়াজ আরও তীব্র হয়ে কানে আসছিল। শুধু আমাদেরই নয়, আশপাশের অনেক যাত্রীরই অসুবিধা হচ্ছিল। কেউ কেউ তাকে আস্তে আওয়াজ করতে বলছিলেন।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শিশুটির পরিবারের বড়রা তাকে কিছুই বলছিলেন না।

আমাদের বিরক্তি ধীরে ধীরে গিয়ে পড়ছিল ওর পরিবারের লোকজনের ওপর।আমরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিলাম,“কী অবাধ্য বাচ্চা!কী অসভ্য আচরণ!”

এরপর আমার স্ত্রীও একটু বিরক্ত হয়ে শিশুটিকে বলল,— “এভাবে চিৎকার করলে কিন্তু পুলিশ এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে!”

কিন্তু বাচ্চাটি নির্বিকার।তার পরিবারও নির্বিকার।

কিছুক্ষণ পর একজন সহযাত্রী শিশুটির বয়স জানতে চাইলেন।

উত্তর এল,— “চার বছর।”

এরপর আরেকজন যাত্রী বললেন,— “অনেকক্ষণ ধরে দেখছি, ও শুধু চিৎকার করে যাচ্ছে। কিন্তু কোন কথা  বলছে না তো!”

তখন শিশুটির পরিবারের একজন খুব শান্ত গলায় বললেন,— “ও কথা বলতে পারে না। শুধু ‘মা’ বলতে পারে। অনেকদিন ধরে চিকিৎসা চলছে। ওকে নিয়েই কলকাতা যাচ্ছি… চিকিৎসার জন্য।”

কথাগুলো শুনে যেন হঠাৎ চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আমরা দু’জনেই চুপ করে গেলাম।মুহূর্তের মধ্যে মনে হল, বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা ভারী পাথর এসে বসেছে।

যে শিশুটির দিকে কয়েক মুহূর্ত আগেও বিরক্ত চোখে তাকাচ্ছিলাম, সেই শিশুটির দিকেই এবার তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছিল।

মনে হচ্ছিল—আহা! কেন যে ওকে বকতে গেলাম!কেন যে বললাম, “চিৎকার কোরো না!”

ও তো জানেই না, কীভাবে নিজের কষ্টটা প্রকাশ করতে হয়।

ও তো কথা বলতে পারে না।ও তো বলতে পারে না—“আমার কষ্ট হচ্ছে।আমার কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। আমাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করো।”

ওর কাছে হয়তো এই চিৎকারটাই একমাত্র ভাষা।ওর পৃথিবীতে হয়তো এই আওয়াজটাই ওর কথা।

আর আমরা সেই ভাষাটাকেই এতক্ষণ বিরক্তিকর শব্দ ভেবে ভুল করছিলাম!

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এরপর সেই শিশুটির চিৎকার আমাদের আর একটুও বিরক্তিকর লাগছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, ও যত জোরেই চিৎকার করে করুক।

কামরার সবাই যেন হঠাৎ বুঝে গেল, এই আওয়াজের পিছনে একটা শিশুর অসহায়ত্ব আছে। একটা পরিবারের দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা আছে। আছে চিকিৎসার জন্য ছুটে বেড়ানোর ক্লান্তি। আছে বুকের মধ্যে জমে থাকা অজস্র ভয়, প্রার্থনা আর আশার গল্প।

কেউ আর শিশুটিকে চুপ করতে বলছিল না।কেউ আর বিরক্ত হচ্ছিল না।আমরা কেউই আর কিছু জানতে চাইনি।কারণ আমরা জানতাম, আরও প্রশ্ন করলে হয়তো পরিবারটির কষ্ট আরও বেড়ে যাবে।

কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো জানতে নেই।

কিছু যন্ত্রণা আছে, যেগুলোর সামনে শুধু নীরবে মাথা নত করতে হয়।

আর সেই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল, মাত্র কিছুক্ষণ আগেও যে শিশুটির দিকে তাকিয়ে আমার রাগ হচ্ছিল, সেই শিশুটির প্রতিই আমাদের বুকের ভেতর থেকে কী গভীর এক মায়া, স্নেহ আর ভালোবাসা উঠে আসছিল !ও তখনও চিৎকার করছিল।

মনে হচ্ছিল, ও যেন নিজের অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করে পৃথিবীকে কিছু একটা বলতে চাইছে। হয়তো ওর চিৎকারের মধ্যে লুকিয়ে আছে হাজারটা না-বলা কথা।

হয়তো ও বলতে চাইছে— “আমারও কিছু বলার আছে।আমিও তো তোমাদের মতোই এই পৃথিবীতে এসেছি…শুধু বলতে পারছি না।”

ট্রেন তখন ছুটে চলেছে কলকাতার দিকে।জানলার বাইরে দৃশ্যগুলো একের পর এক পিছনে চলে যাচ্ছে।আর আমাদের দু’জনের মনটা যেন কোথাও আটকে গেছে সেই চার বছরের ছোট্ট শিশুটির কাছে।

সেদিন বুঝলাম—মানুষকে আমরা কত সহজেই বিচার করে ফেলি!

কাউকে দেখে বলি, “অসভ্য।”

কাউকে দেখে বলি, “অবাধ্য।”

কাউকে দেখে বিরক্ত হই।

কিন্তু তার আচরণের পিছনে যে কী গভীর কষ্ট লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমরা জানিই না।

একটু আগে যে শিশুটির চিৎকার আমাদের ঘুম ভেঙে দিয়েছিল, সেই শিশুটিই শেষ পর্যন্ত আমাদের মনের দরজাটা খুলে দিয়ে গেল।

সেদিন বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে আমরা শুধু শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা আসিনি।আমরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি একটা শিক্ষা—

কাউকে বিচার করার আগে একবার ভাবো, তার না-বলা গল্পটা তুমি জানো তো?

কারণ অনেক সময়, যেটাকে আমরা বিরক্তিকর আওয়াজ বলে মনে করি, সেটাই হয়তো কারও জীবনের একমাত্র ভাষা।

আর কিছু কিছু চিৎকার…

শুনতে হয় কান দিয়ে নয়,

হৃদয় দিয়ে

Leave a comment