সার্থক আর সাথীর সংসারে আর একজন সদস্য আছে । তার জন্য আলাদা ঘর লাগে না, আলাদা খাবারও লাগে না, কিন্তু সে সংসারের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি।
তার নাম— মোবাইল মহারাজ।সকালে ঘুম থেকে উঠেই দুজনের প্রথম দর্শন হয় মোবাইল মহারাজের। তারপর একে অপরের।
একদিন সাথী ইউটিউবে নতুন রেসিপি দেখতে দেখতে মাছের ঝোলের জায়গায় ঠাণ্ডা পায়েস গরম করতে দিল গ্যাসওভেনে।
ভিডিওতে তখন একজন বলছেন—”বন্ধুরা, আজ আমি শেখাব কীভাবে পাঁচ মিনিটে অসাধারণ মিষ্টি তৈরি করবেন!”
সাথী মুগ্ধ হয়ে ভিডিওটা দেখছিল ।পাঁচ মিনিট পার হল। দশ মিনিট পার হল। পনেরো মিনিট পার হল। হঠাৎ রান্নাঘর থেকে পোড়া গন্ধ! দৌড়ে গিয়ে দেখলো , পায়েস আর পায়েস নেই।
গ্যাসের আগুনে সেটা যেন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে পাওয়া কোনো প্রাচীন কালো পাথর!
সার্থক এসে বলল ,—”এটা কি পায়েস?”
—”ছিল।”
—”এখন?”
—”এখন ইতিহাস।”
আরেকদিন দুপুরে সাথী ফোনে এক আত্মীয়ার সঙ্গে গল্প করতে করতে রান্না করছিল।
আত্মীয়া বলছেন,—”তারপর জানো, ওদের মেয়ে শুনলাম প্রেম করছে …”
গল্প এত জমে গেল যে সাথী ভুলেই গেল কড়াইয়ে কী দিয়েছে।
ফলাফল? ডালে চিনি। পায়েসে নুন। আলুর দমে দু’বার হলুদ।
খেতে বসে সার্থক প্রথম চামচ মুখে দিয়ে থমকে গেল।
—”আজকের রান্নার নাম কী?”
—”কেন?”
—”কারণ এটা বাংলা রান্না, চাইনিজ রান্না না বিজ্ঞান গবেষণা—আমি বুঝতে পারছি না!”
সাথী নিজে খেয়ে বলল,—”আহা রে! ডালে চিনি গেল কী করে?”
সার্থক হেসে বলল,—”মোবাইলের আশীর্বাদ!”
এরপর শুরু হল খাবার পরিবেশনের কাহিনি।
এক রবিবার দুপুরে সার্থক টেবিলে বসে আছে।খাবার আসছে না।
দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। কুড়ি মিনিট।
অবশেষে সে রান্নাঘরে উঁকি দিল আর দেখল , সাথী মোবাইলে একটি নাটক দেখছে।
নাটকে তখন নায়িকা কাঁদছে। সাথীও আবেগে কাঁদছে।
রান্নাঘরে ভাত তৈরি। ডাল তৈরি।তরকারি তৈরি।সব তৈরি।শুধু টেবিলে আসার অপেক্ষা।
সার্থক বলল,—”খাবার কি অনলাইনে ডেলিভারি হবে?”
সাথী চমকে উঠল।
—”ওমা! তোমাকে খেতে দিইনি?”
—”আমি তো ভাবছিলাম, হয়তো খাবারটা অ্যাপ দিয়ে বুক করতে হবে!”
—না, না আমি এখনি দিচ্ছি ।
সার্থক হাসতে হাসতে বলল —”আমি এখানে ক্ষিদায় কাঁদছি, ওখানে নায়িকা কাঁদছে, তুমি কাকে আগে সামলাবে?”
রাতে আবার নতুন সমস্যা। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা । সার্থকের চোখে ঘুম। কিন্তু ঘরে আলো জ্বলছে।সাথী বিছানায় শুয়ে মোবাইলে রিল দেখছে।
একটা শেষ ভিডিও।তারপর আরেকটা।তারপর আরেকটা।
সার্থক বলল,—”ঘুমোবে না?”
—”এই শেষটা দেখছি।”
পনেরো মিনিট পরে—
—”এই শেষটা।”
আধঘণ্টা পরে—
—”সত্যি, এই শেষটা।”
এক ঘণ্টা পরে সার্থক দেখল, পৃথিবীতে দুটি জিনিসের শেষ নেই।
এক, মানুষের আশা।দুই, মোবাইলের ভিডিও।শেষে সার্থক বালিশ দিয়ে চোখ ঢেকে ঘুমাল।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ঘটনা ঘটল একদিন সন্ধ্যায়।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
ওয়াই-ফাই বন্ধ।মোবাইলের চার্জ মাত্র দুই শতাংশ।মোবাইল মহারাজ অসুস্থ।
দুজনেই চুপচাপ বসে আছে।
কিছুক্ষণ পরে সাথী বলল,—”শোনো, মনে আছে? বিয়ের পর আমরা ছাদে বসে কত গল্প করতাম।”
সার্থক হেসে বলল,—”মনে আছে। তখন তো মোবাইল মহারাজ জন্মায়নি।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
তারপর গল্প শুরু হল। পুরোনো স্মৃতি। ভুলভ্রান্তি। প্রথম দেখা। প্রথম ঝগড়া। প্রথম বেড়ানো। কথা বলতে বলতে তারা খেয়ালই করল না, দুই ঘণ্টা কেটে গেছে।
পরদিন সকালে সাথী ঘোষণা করল,—”নতুন নিয়ম!”
১. খাওয়ার সময় মোবাইল নয়। ২. রান্নার সময় মোবাইল নয়। ৩. ঘুমানোর আধঘণ্টা আগে মোবাইল বন্ধ। ৪. প্রতিদিন কিছু সময় শুধু নিজেদের জন্য।
সার্থক বলল ,—”খুব ভালো। তবে একটা নিয়ম আরও যোগ করো।”
—”কী?”
—”খাবার গরম করার সময় ভিডিও দেখা নিষেধ!”
দুজনেই হেসে উঠল।
গল্প শেষ তবে চুপি চুপি একটা কথা বলি — ওদের জীবনে মোবাইল আর সময়ের মালিক হতে পারেনি । কারণ ওরা বুঝেছে যে পরিবারের মানুষের মুখের হাসি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর “নোটিফিকেশন । যে কোনো স্ক্রিনের আলোর চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল।