অনলাইন বাজারের কাণ্ডকারখানা – সুপ্রিয় রায়

সার্থকবাবুর বয়স সত্তর পেরিয়েছে। সাথী দেবীরও ষাটের কোঠা অনেক আগেই পেরিয়েছে। কিন্তু একটা বিষয়ে দু’জনের অদ্ভুত মিল ছিল—তাঁরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের বয়স বাড়ে, শেখার বয়স নয়।

তবে কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবে মানা তত সহজ নয়!

সকালে চা খেতে খেতে সাথী দেবী বললেন,— শোনো, আজ আর বাজারে যেতে হবে না। সবকিছু অনলাইনে অর্ডার করে দাও।

সার্থকবাবু বুক ফুলিয়ে বললেন,— সে আর এমন কী! আমি এখন পুরো ডিজিটাল যুগের মানুষ।

সাথী দেবী মুচকি হেসে বললেন,— হ্যাঁ, গত সপ্তাহে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিলে, “মোবাইলটা কোথায় রেখেছি?”

— ওটা গবেষণা ছিল!

— কীসের গবেষণা?

— আলো জ্বললে মোবাইলকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না!

সাথী দেবী হেসে ফেললেন।

সার্থকবাবু মোবাইল হাতে নিয়ে অনলাইন বাজার শুরু করলেন।

তালিকায় ছিল—
আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, ডিম, বিস্কুট আর চা-পাতা।

প্রথমদিকে সব ঠিকঠাকই চলছিল।

হঠাৎ স্ক্রিনে ভেসে উঠল—

“আপনার জন্য বিশেষ অফার!”

সার্থকবাবুর চোখ চকচক করে উঠল।

— আহা! এরা আমার কথা কত ভাবে!

তারপর তিনি একের পর এক “Add to Cart” করতে লাগলেন।

এক ঘণ্টা পরে সাথী দেবী এসে জিজ্ঞেস করলেন,— বাজার হলো?

— একদম!

— কত টাকা?

— খুব বেশি নয়… মাত্র এগারো হাজার।

— কীইই?

সাথী দেবী প্রায় চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন।

— আমরা কি পুরো পাড়া খাওয়াব?

তাড়াতাড়ি কার্ট খুলে দেখা গেল—

দুই কেজি আলুর বদলে কুড়ি কেজি আলু,

এক প্যাকেট বিস্কুটের বদলে বিশ প্যাকেট,

আর পাঁচশো গ্রামের চা-পাতার বদলে পাঁচ কেজি!

সাথী দেবী মাথায় হাত দিয়ে বললেন,

— এত চা-পাতা দিয়ে কী করবে?

সার্থকবাবু গম্ভীর মুখে বললেন,— ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।

— চা-পাতা কি শেয়ার মার্কেট?

— কে জানে! যদি একদিন চায়ের দাম সোনার মতো হয়ে যায়?

ঠিক তখনই বৌমার ভিডিও কল আসলো ।

সব শুনে সে হেসে গড়াগড়ি।

— বাবা, তোমরা কী অর্ডার করেছিলে?

— আমরা তো আলু-পেঁয়াজ চেয়েছিলাম।

বৌমা কার্ট দেখে বলল,

— বাবা, তুমি “Recommended for You” দেখে সব কার্টে ভরে দিয়েছ!

— ওরা যখন বলল “তোমার জন্য”, তখন ভাবলাম নিশ্চয়ই আমার ভালোর জন্যই বলছে!

সাথী দেবী বললেন,— আমি তো অনেকদিন ধরেই বলছি, মোবাইল আর রিমোটটা ভালো করে শিখে নাও।

বৌমা অনলাইনে লগইন করে সব ঠিক করে দিল।

বাজারের ঝামেলাও মিটল।

তারপর সে বলল,— বাবা, একটা কথা মনে রাখবে। অনলাইনে যা দেখি, তার সবকিছু আমাদের প্রয়োজন হয় না।

সার্থকবাবু মাথা নেড়ে বললেন,— তা ঠিক। অফারগুলো দেখে মনে হচ্ছিল না কিনলে যেন জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে!

বৌমা হেসে বলল,— এটাই তো অনলাইন বাজারের কৌশল। আগে প্রয়োজনের তালিকা, তারপর কেনাকাটা। না হলে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে ফেলে।

সাথী দেবী বললেন,— মানে প্রযুক্তি খারাপ নয়, ব্যবহারটা বুঝে করতে হয়।

— একদম। প্রযুক্তি সময় বাঁচায়, কিন্তু বুদ্ধি ছাড়া ব্যবহার করলে টাকাও নষ্ট করে।

বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নেমেছে।

ঘরের মধ্যে চায়ের গন্ধ।

আর সেই চিরচেনা খুনসুটি।

এত বছরের সংসারে তাঁরা বুঝে গিয়েছেন—

অনলাইন বাজারে ভুল অর্ডার ঠিক করা যায়, কিন্তু জীবনের বাজারে সঠিক মানুষকে পাশে পাওয়া সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য।

কিন্তু সচেতনতা ছাড়া প্রযুক্তি যেমন সময় নষ্ট করতে পারে, তেমনি অর্থও নষ্ট করতে পারে।

তাই অনলাইনে ক্লিক করার আগে একবার ভাবা যেমন প্রয়োজন, তেমনি জীবনের পথে চলার সময়ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

সন্ধ্যার আকাশে তখন লালচে আভা।

ওদের পা দুটো আর আগের মতো দ্রুত নয়, কিন্তু কৌতূহলটা এখনও তরুণ।

কারণ তাঁরা শিখে গিয়েছেন — জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, নতুন কিছু শেখার আনন্দের কোনো বয়সসীমা নেই।

স্কুলের ক্লাসরুম একদিন শেষ হয়, কিন্তু শেখার ক্লাসরুম কখনও শেষ হয় না।

যে মানুষ কৌতূহল বাঁচিয়ে রাখতে পারে, সে বয়সে বৃদ্ধ হলেও মনে চিরতরুণ থাকে।

জানালার বাইরে তখন রাত নেমেছে।

কিন্তু তাঁদের জীবনে কৌতূহলের আলো এখনও জ্বলছে।

কারণ তাঁরা বুঝে গিয়েছেন — বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় বাড়ে।

মনের ভেতর নতুন কিছু জানার ইচ্ছে বেঁচে থাকলে মানুষ কখনও সত্যিকারের বুড়ো হয় না।

আর তাই সার্থকবাবু ও সাথী দেবীর জীবনে নতুন শেখার গল্পের শেষ নেই।তাই আমাদেরও গল্পও চলতে থাকবে ।

Leave a comment