ভূত যদি সাক্ষী হতো ! – সুপ্রিয় রায়

এই প্রযুক্তির যুগে  কোনো ঘটনা ঘটতে না ঘটতেই খবর, ভিডিও আর নানা বিশ্লেষণে চারদিক ভরে যায়। এত তথ্যের ভিড়ে আসল সত্যিটাই যেন সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যায়—কোনটা বাস্তব, আর কোনটা সাজানো, তা বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ে। এক চ্যানেল এক কথা বলছে, অন্য চ্যানেল ঠিক তার উল্টো। সামাজিক মাধ্যমে মিনিটে মিনিটে নতুন ভিডিও, নতুন বিশ্লেষণ, নতুন বিশেষজ্ঞ। এত সত্যির ভিড়ে সত্যিটাই কোথায় হারিয়ে যায়।

তার ওপর আমাদের দেশে ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক রং, পরিচিতির জোর—সব মিলিয়ে আদালতের রায় বেরিয়ে যাওয়ার পরও অনেকের মনে প্রশ্ন থেকে যায়, আসল অপরাধীরই কি শাস্তি হলো?

এই সব ভেবেই মাঝে মাঝে মনে হয়, অন্তত খুনের মামলায় যদি ভূত বলে সত্যিই কিছু থাকত, তাহলে বিচারব্যবস্থার অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।

খুনের তদন্ত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তদন্তকারী অফিসার শুধু বলতেন,
— “আচ্ছা, নিহত ভদ্রলোককে একবার ডেকে আনুন তো!”

দু’মিনিটের মধ্যেই হালকা স্বচ্ছ, একটু ভাসমান এক ভুত এসে হাজির।

— “বলুন তো, আপনাকে কে খুন করেছে?”

ভূত নিশ্চিন্তে উত্তর দিত,— “ওই যে, বাইরে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে কাঁদছেন, মাঝেমধ্যে রুমাল দিয়ে চোখ মুছছেন, আর বলছেন ‘ওঁর সঙ্গে আমার দারুন সম্পর্ক ছিল ‘—উনিই।”

ব্যস! তদন্ত শেষ।

না লাগত ফরেনসিক, না সিসিটিভি, না প্রত্যক্ষদর্শী। মৃত ব্যক্তিই যখন প্রত্যক্ষদর্শী, তখন আর কারও সাক্ষ্যের প্রয়োজন কী!

আদালতের দৃশ্যও বেশ উপভোগ্য হতো।

বিচারক বলতেন ,— “সাক্ষীকে শপথ করান।”

ভূত মুচকি হেসে উত্তর দিত , “মাই লর্ড, শপথ তো তাদেরই দরকার, যারা মিথ্যে বলতে পারে। আমি সেই অভ্যাসটা পৃথিবীতেই ফেলে এসেছি। তাই গীতা ছুঁয়ে শপথ নেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখছি না।”

শুনে উকিলবাবুর মুখ হতো একটু ফ্যাকাশে। কারণ, ভূতকে জেরা করার কৌশল আইন কলেজে এখনও পড়ানো হয় না।

তবে সব সুবিধার মধ্যেও একটা মারাত্মক অসুবিধা আছে ।

ভূতেরা যদি সত্যিই থাকতো , তাহলে শুধু খুনের মামলাই নয়, পৃথিবীর অগণিত পারিবারিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক রহস্যও একে একে ফাঁস হয়ে যেত।

কোনো ভূত হয়তো আদালতে হাজির হয়ে বলত,
“মাই লর্ড, আমাকে কে খুন করেছে সেটা তো বললাম। তবে যেহেতু এসে পড়েছি, আর দু-চারটে ছোটখাটো সত্যিও বলে যাই…”

তারপর আদালতের এজলাসে যে নীরবতা নেমে আসত, তা সম্ভবত ইতিহাসে লেখা থাকত।

“ভূত না থাকায় খুনিরা বেঁচে যায় কি না জানি না, তবে অনেক সম্মানিত মানুষের সম্মান যে বেঁচে যায়, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত!”

22 thoughts on “ভূত যদি সাক্ষী হতো ! – সুপ্রিয় রায়”

  1. Champak Mitra

    সমাজ সংস্কৃতি বর্তমানে একটা অস্থিরতায় আক্রান্ত যেখানে বিশ্বাস করতে সমাজ দ্বিধাগ্রস্ত। কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা, উপস্থিত মানষিকতার লক্ষন গোলমেলে মনে হয় ভুতই ভবিষ্যত প্রযুক্তি কিচ্ছু করার নেই।

    Like

  2. Sudhir Bagchi

    সত্যি তোমার মাথায় আসেও ভাই। দারুন দারুন খুব ভাল লিখেছ খুব ভাল লাগল। যুগলে ছবিটাও খুব সুন্দর লাগছে। ভাল থাকো সবাইকে নিয়ে।

    Like

  3. Ratnabali Chatterjee

    আরো একটা নতুন ধরনের লেখা পড়লাম। তবে ভূতেরা যদি সত্যিই আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিত তবে কিছু দুর্বল হৃদয় মানুষ নির্ঘাত তখনি পটল তুলে ভূতেদের সংখ্যা বাড়িয়ে দিতেন। শরদীন্দু বন্দোপাধ্যায় তাঁর ভৌতিক গল্পগুলিতে এই ধরনের ভৌতিক অস্তিত্ব নিয়ে লিখেছেন।

    খুব নতুন বিষয় নিয়ে একটা প্রতিবেদন বেশ ভাল লাগল।

    Like

  4. Shibani Roychowdhury
    এই ভূত পর্বটি অনিক দত্তকেও ছাড়িয়ে গেছে।আমি ভূতকে এখনো ভয় পাই কারণ ঘাড়ে এসে না চেপে পরে। লেখাটি খুব আনন্দ দিল।

    Like

  5. Chandana Banerjee

    অদ্ভুত ।ভূত সম্পর্কে এই অসাধারণ বিশ্লেষণ অভূতপূর্ব। চমৎকার লেখা।পড়ে খুব ভালো লাগলো।এমনিতেই আমি ভূতেদের খুবই শ্রদ্ধা ভক্তি করি। সেই শ্রদ্ধা আরো ঘনীভূত হলো আপনার লেখা পড়ে। ধন্যবাদ দাদা।

    Like

  6. Hiren Sarkar

    খুব সুন্দর লেখা, তোমার মাথায় এলো বলে আমরাও কিছু পেলাম। পরের লেখার অপেক্ষায় থাকলাম। ভালো থেকো।

    Like

  7. Chandana Banerjee

    দাদা বৌদি আপনাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এমন সুন্দর ভৌতিক বাস্তব লেখাটি পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আরও লেখা পড়তে চাই

    Like

  8. Dalia Deb
    Technology jevabe egochche tate vut j samne asbe na ..k bolte pare.. hoyto evabei….🫣🫣😝😝😝😝😝mukhosdhari vut to dekhchi…..ebar na hoy asol vut dekhbo

    Like

Leave a Reply