জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার গল্প- সুপ্রিয় রায়

শিলিগুড়ির এক শান্ত আবাসনে থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী সার্থকবাবু আর তাঁর স্ত্রী সাথীদেবী। সার্থকবাবুর বয়স সত্তর পেরিয়েছে,  আর সাথীদেবীর বয়স ষাটের গণ্ডি পার হয়েছে। দু’জনেই সিনিয়র সিটিজেন, কিন্তু মনটা এখনও তরুণ।

সার্থকবাবুর নেশা ভ্রমণ, লেখালেখি আর ছোট ছোট সাংস্কৃতিক ও ভ্রমণ ভিডিও বানানো। সাথীদেবীর শখ গান, ছবি আঁকা আর স্বামীর সঙ্গে সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া।

দুই ছেলে চাকরির সূত্রে দেশের বাইরে। কিন্তু দূরত্ব শুধু মানচিত্রে। রোজ ভিডিও কল, ডাক্তার দেখানো, অনলাইন বাজার—সবকিছুর খবর রাখে তারা।

দু’জনের ছোট্ট সংসার। কখনও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত, কখনও হঠাৎ ট্রেনের বা প্লেনের  টিকিট কেটে বা গাড়ি নিয়ে কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে পড়া। জীবনটা বেশ আনন্দেই কাটছিল।

তবে একটা সমস্যা ছিল। তাঁরা দু’জনেই অতি সামান্য কারনে ঝগড়া করতো ! সকালের চা থেকে রাতের টিভির রিমোট—যে কোনো বিষয়েই তর্ক শুরু হয়ে যেত ।

নতুন কেউ শুনলে ভাবত, আজ বুঝি সংসার ভেঙে যাবে!

কিন্তু আত্মীয় স্বজন জানত, এদের ঝগড়া না হলেই বরং চিন্তার বিষয়।

একদিন সকালে সাথীদেবী খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বললেন,— জানো, এক গবেষণায় নাকি দেখা গেছে বিবাহিত পুরুষেরা অবিবাহিতদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচে!

সার্থকবাবু চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,— অবশ্যই বাঁচবে। দায়িত্ব-কর্তব্য এত বেশি থাকে যে মরারও সময় পায় না!

— তার মানে আমি তোমার জীবন দুর্বিষহ করে দিয়েছি?

সার্থকবাবু  — আরে না! আমি শুধু বলছি, বিবাহিত জীবন হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ অ্যাডভেঞ্চার ট্যুর!

— তাহলে আমি কী?

— ট্যুর গাইড!

— আর তুমি?

— হারিয়ে যাওয়া পর্যটক!

সাথীদেবী হেসে বললেন,— ঠিকই বলেছ। তবে এই পর্যটককে সামলাতে সামলাতে আমার ট্যুর গাইডের ডিগ্রি হয়ে গেছে। তবে চিন্তা নেই, এত বছর ধরে পথ হারালেও শেষমেশ এসে আমার কাছেই পৌঁছে যাবে ।

সকালে চা বানায় সাথীদেবী আর বিকালে চা বানায় সার্থকবাবু । সেদিন বিকেলে আবার এক নতুন কাণ্ড।

সার্থকবাবু চা করতে গিয়ে চিৎকার শুরু করলেন,— আমার নীল কাপটা কোথায়?

— রান্নাঘরে।

— নেই তো!

— চশমা পরেছো?

— হ্যাঁ।

— তাহলে হাতে কী ধরে আছ?

সার্থকবাবু নিচে তাকিয়ে দেখলেন, কাপটা তাঁর হাতেই।

সাথীদেবী বললেন,— কাপটা হাতে নিয়েই যদি খুঁজতে থাকো, তাহলে একদিন আমাকেও খুঁজে বেড়াবে, আর আমি তোমার পাশেই বসে থাকব!

— বয়স হয়েছে বলে মজা করছ?

— না, বয়স না হলে তো তোমাকে নিয়ে গবেষণা করতাম!

দু’জনেই হেসে ফেললেন।

এমন সময় পাশের ফ্ল্যাটের নতুন বিবাহিতা স্ত্রী স্নিগ্ধার আগমন।

স্নিগ্ধা মুখ গোমড়া করে বলল,— কাকু, আমাদের প্রায়ই ঝগড়া হচ্ছে । মনে হচ্ছে সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে ।

সার্থকবাবু বললেন,— বল কি ? আমরা চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে ঝগড়া করছি। এখনও টিকে আছি।

স্নিগ্ধা অবাক।

— কীভাবে?

সাথীদেবী বললেন,— ঝগড়াটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, ঝগড়ার পরে কে আগে অন্যের কাছে ফিরে আসবে ।

সার্থকবাবু যোগ করলেন,— আমরা কখনও জেতার জন্য ঝগড়া করিনি। মতের অমিল হয়েছে, তারপর আবার একসঙ্গে চা খেয়েছি।

— আর এখন?

— এখন আমরা পেশাদার ঝগড়াটে!

সবাই হেসে উঠল।

কয়েকদিন পর সার্থকবাবুর হালকা জ্বর এলো।

সারা রাত সাথীদেবী একবারও ঘুমোলেন না।কখন জল খাওয়াচ্ছেন, কখন কপালে ভেজা কাপড় দিচ্ছেন।

পরদিন জ্বর একটু কমতেই সার্থকবাবু বললেন,— এত চিন্তা করার কী ছিল?

সাথীদেবী মুখ ঘুরিয়ে বললেন,— চিন্তা করিনি। শুধু ভাবছিলাম, তুমি অসুস্থ হলে আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে কে?

— তাই নাকি?

— হ্যাঁ। তুমি না থাকলে বাড়িটা খুব চুপচাপ হয়ে যাবে।

সার্থকবাবু ধীরে ধীরে তাঁর হাতটা ধরলেন।

— আর তুমি না থাকলে আমিও কার সঙ্গে ঝগড়া করব?

দু’জনেই হেসে ফেললেন।

সেদিন বিকালে বারান্দায় বসে পাহাড় দেখতে দেখতে সার্থকবাবু বললেন,—  তুমি তো জানো সাথী , আমাদের জীবনে টাকা খুব বেশি ছিল না। বড় বাড়িও ছিল না।

— কিন্তু আনন্দ ছিল।

— কারণ আমরা সুখের জন্য অপেক্ষা করিনি। নিজেরাই সুখ তৈরি করেছি।

সাথীদেবী মৃদু হেসে বললেন,— আর একে অপরকে কখনও একা হতে দিইনি।

সন্ধ্যা নামতেই আবাসনের প্রতিটি আলো যেন একে একে জ্বলে উঠল, আর তাদের ঝিলমিল আলোয় চারপাশ ভরে উঠল এক উষ্ণ, প্রাণবন্ত ও আপন অনুভূতিতে।

দু’জনের মুখেও সেই আলো।

তখন মনে হচ্ছিল, সুখী পরিবার মানে যেখানে ঝগড়া নেই, তা নয়।

সুখী পরিবার মানে যেখানে ঝগড়ার মধ্যেও টান থাকে, অভিমানের মধ্যেও যত্ন থাকে, আর বয়স বাড়লেও একসঙ্গে নতুন কিছু শেখার ইচ্ছা থাকে।

ভালোবাসা শুধু ফুল, চকলেট আর রোম্যান্স নয়।

ভালোবাসা হলো প্রতিদিন একই মানুষটাকে নতুন করে বেছে নেওয়া।

কখনও হাসতে হাসতে।

কখনও ঝগড়া করতে করতে।

আর কখনও এক কাপ চায়ের আড়ালে চুপচাপ পাশে বসে থেকে।

Leave a comment