নতুন বৌয়ের প্রথম রান্নার হাস্যকর অভিজ্ঞতা- সুপ্রিয় রায়

বিয়ের পরের সপ্তাহ। নতুন বৌ সাথীর শশুরবাড়িতে আজ একটা বিশেষ দিন। কারণ আজ শশুরবাড়িতে “নতুন বৌয়ের প্রথম রান্না”!এখনও সব আত্মীয় স্বজন যায়নি । বাড়িটা গম গম করছে ।

সকাল থেকেই বাড়িতে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা। যেন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ বসেছে। সাথী খুব উৎসাহ নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকল।

পিসিশাশুড়ি রান্নাঘরে উঁকি মেরে বললেন— “বৌমা, ভয় পেয়ো না… আমরা সবাই এখনও বেঁচে আছি!”

সাথী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,— “চিন্তা করবেন না পিসি , ইউটিউব দেখে ঠিক বানিয়ে নেব !”

এই কথা শুনে শাশুড়ি একটু চিন্তিত হলেও কিছু বললেন না। পাশ থেকে জেঠিমা ফিক করে হেসে উঠলেন।

সবার সামনে আত্মবিশ্বাস দেখালেও সাথীর হাত-পা কিন্তু তখন ঠান্ডা। নিজের বাড়িতে সে মাঝে মাঝে ম্যাগি আর ডিমভাজা বানালেও এখানে সবাই এমনভাবে তাকিয়ে আছে, যেন সে পাঁচতারা হোটেলের শেফ!

শাশুড়ি বললেন— “খুব বেশি কিছু না মা, শুধু ভাত, ডাল, আলুভাজা আর ডিমের ঝোল করো।”

সাথী মনে মনে ভাবল—“এটাই যদি ‘খুব বেশি কিছু না’ হয়, তাহলে বেশি কিছু হলে কি বিরিয়ানি-ফিরনি-রসগোল্লা একসঙ্গে বানাতে হতো?”

রান্না শুরু হলো। প্রথম বিপদ ভাতে। কতটা জল দিতে হয় সেটা ইউটিউবে দেখেছিল, কিন্তু সেখানে কেউ বলেনি—“শাশুড়ি পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলে হাত কাঁপে কিনা !”

ফলে ভাত হলো এমন, দেখে মনে হচ্ছে সে যেন চালের সভা! প্রত্যেকটা দানা আলাদা আলাদা হয়ে ঘোষণা করছে —’আমরা এখনও পুরো বড় হইনি!’

তারপর  ডাল বসানো হলো। ইউটিউবে দেখে সাথী ভাবল, “এক চামচ নুন” মানে নিশ্চয়ই বড় ভাত খাওয়ার চামচ। ফলে ডালে এমন নুন পড়ল যে ডাল নয়, যেন সমুদ্রের জল!

সাথী তাড়াতাড়ি আলু ফেলে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করল।
এখন ডালের স্বাদ—একটু আলু, কিছুটা আতঙ্ক, আর অনেকটা নুন,!

এরপর আলুভাজা। তেল গরম হচ্ছে কি না বুঝতে না পেরে একটা আলুর টুকরো ফেলার বদলে একমুঠো আলু ঢেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে “ছ্যাঁক ছ্যাঁক” শব্দে এমন তেল ছিটল যে সাথী  এক লাফে রান্নাঘরের দরজার কাছে পৌঁছে গেল।

শ্বশুরমশাই বাইরে থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

— “কী রে, রান্না হচ্ছে না যুদ্ধ হচ্ছে?”

সবাই হেসে উঠল।

এবার ডিমের ঝোল।

দুপুরে সবাই খেতে বসল।

সাথীর বুক তখন ঢিপঢিপ করছে। মনে হচ্ছে রেজাল্ট বেরোবে।

প্রথমে শ্বশুরমশাই ডাল খেলেন।একটু থেমে জল খেলেন।
তারপর বললেন— “হুম… নুনটা বেশ… উদারভাবে দেওয়া হয়েছে।”

পাশ থেকে দেওর ফিসফিস করে বলল— “ডাল না, এটা তো প্রায় সমুদ্র!”

সবাই হেসে ফেলল।

সাথী লজ্জায় মাথা নিচু করতেই শাশুড়ি হেসে বললেন— “প্রথম রান্নায় এমন হয়ই। আমি তো বিয়ের পর প্রথম দিন চিনি দিয়ে ডাল বানিয়েছিলাম!”

এবার সবাই আরও জোরে হেসে উঠল।

সবাইকে থামিয়ে সার্থক( সাথীর স্বামী ) বলল,- “আগে মেয়েরাই মূলত সংসার সামলাত, তাই ছোটবেলা থেকেই ঘরের কাজ শিখত। এখন মেয়েরা পড়াশোনা, চাকরি আর নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকেই বেশি মন দেয়; বিয়ের আগে বাড়িতে রান্নাবান্নার সুযোগও অনেকের কম হয়। তাছাড়া আজকাল ছেলে-মেয়ে দুজনেই বাইরে কাজ করে, ঘরের কাজও ভাগ করে নেয়। তাই আমার মনে হয়, আজকের এই রান্না ইতিহাসে জায়গা করে নেবে!”

সাথী ভয় পেয়ে বলল— “এত খারাপ?”

সার্থক হেসে বলল— “না, কারণ এই প্রথম কেউ ডিমের ঝোলে এত ভালোবাসা আর এত নুন একসঙ্গে দিয়েছে!”

হাসির রোল পড়ে গেল পুরো বাড়িতে।

সবশেষে এল পায়েস। সাথী খুব যত্ন করে কাউকে না জানিয়ে পায়েস বানিয়েছে । পায়েস দেখে সবাই প্রশংসা করল,— “বাহ! পায়েসটা তো বেশ হয়েছে।”

সাথী গর্ব করে বলল,— “জানো , আমি নিজে বানিয়েছি!”

তখন পাশ থেকে ছোট দেওর বলল,— “হ্যাঁ বৌদি, শুধু একটা প্রশ্ন। পায়েসে এলাচের বদলে পাঁচফোড়ন দিলে নতুন কোনো রেসিপি হয় নাকি?”

সবাই চুপ করে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। তারপর এমন হাসি শুরু হলো যে কারও মুখে আর পায়েস তোলা গেল না।

সাথী লজ্জা পেয়ে বলল,— “আরে! দুটোই তো ছোট ছোট দানা, ভুল হয়ে গেছে!”

সেদিন রাতে সাথী  বুঝল— সংসারে প্রথম রান্নার স্বাদ যতটা না খাবারে থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে স্মৃতিতে।

সেদিনের রান্না হয়তো নিখুঁত হয়নি, কিন্তু সেই নোনতা ডাল, ভয় পাওয়া আলুভাজা আর পাঁচফোড়ন-ওয়ালা পায়েসের গল্প আজও পরিবারের আড্ডায় উঠলেই সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়।

আর সেই স্মৃতিগুলোই পরে একদিন পরিবারের সবচেয়ে মজার গল্প হয়ে যায়।

কারও অভিজ্ঞতা শেয়ার করলে ভাল লাগবে ।

Leave a comment