বিয়ের পর প্রথম তিন বছর সার্থক আর সাথীর জীবনটা ছিল বেশ ছন্দময়।
হঠাৎ সিনেমা দেখতে যাওয়া, রাত করে গল্প করা, উইকেন্ডে বাইরে খেতে যাওয়া— সবকিছুতেই যেন একটা নির্ভেজাল আনন্দ ছিল।
তারপর তাদের জীবনে এল ছোট্ট সহেলি ।
ঘর ভরে গেল নতুন গন্ধে— বেবি পাউডার, ছোট ছোট জামাকাপড়, দুধের বোতল, আর রাত জাগার ক্লান্তি।
প্রথম কয়েকদিন সবকিছুই যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল।
সার্থক মেয়েকে কোলে নিয়ে বলত,— “দেখো তো, একেবারে তোমার মতো হয়েছে।”
সাথী ক্লান্ত মুখে হেসে বলত,— “না, নাকটা পুরো তোমার।”
কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতা সামনে এল।
রাতে আর ঠিকমতো ঘুম নেই।
সহেলি একটু পরপর কেঁদে ওঠে।
সাথীর শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত।
সারাদিন বাচ্চাকে সামলে, ঘরের কাজ সামলে, নিজের জন্য তার আর সময়ই থাকে না।
একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাথী নিজেকেই চিনতে পারছিল না।
অগোছালো চুল, চোখের নীচে কালি, ক্লান্ত মুখ।
সার্থক অফিস থেকে ফিরে বলল,— “আজ খুব ক্লান্ত লাগছে, একটু চা দেবে?”
সাথী হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বলল,— “আমি কি সারাদিন বিশ্রাম নিয়েছি?”
সার্থক থমকে গেল।
— “আমি তো শুধু চা চেয়েছিলাম।”
সাথীর চোখে জল এসে গেল।
— “তুমি শুধু চা চেয়েছ, আর আমি শুধু একটু সাহায্য চাইছি।”
ঘরটা হঠাৎ নীরব হয়ে গেল।
সার্থক তখন প্রথমবার সত্যিই বুঝল— বাবা হওয়া আর মা হওয়া একই অভিজ্ঞতা নয়।
সে ধীরে ধীরে সাথীর পাশে গিয়ে বসে বলল,— “সরি। আমি হয়তো বুঝতেই পারিনি তুমি কতটা ক্লান্ত।”
সাথী চোখ মুছে বলল,— “আমিও আগের মতো নেই। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা শুধু সহেলির বাবা-মা হয়ে গেছি, স্বামী-স্ত্রী নেই।”
সার্থক কিছুক্ষণ ভেবে বলল,— “তাহলে আমাদের সেটা ফিরিয়ে আনতে হবে।”
পরদিন থেকে ছোট ছোট বদল শুরু হলো।
রাতে সহেলিকে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব দু’জনে ভাগ করে নিল।
সপ্তাহে একদিন সার্থক নিজে রান্না করল।
আর রাতে সহেলি ঘুমিয়ে গেলে দশ মিনিট হলেও দু’জনে একসঙ্গে বসে গল্প করত।
একদিন সাথী বলল,— “জানো, সন্তান আসার পর সব বদলে যায়।”
সার্থক হেসে উত্তর দিল,— “হ্যাঁ, কিন্তু বদলে যাওয়াটা খারাপ নয়। শুধু সম্পর্কটাকেও নতুনভাবে সাজাতে হয়।”
সাথী সহেলির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
তাদের প্রেম আগের মতো হালকা নেই, তার বদলে এসেছে আরও গভীর এক বন্ধন।
এখন তাদের ভালোবাসার মাঝে নতুন কেউ এসেছে—
যে দূরত্বও তৈরি করে, আবার দু’জনকে আরও শক্তভাবে বেঁধেও রাখে।
সার্থক সাথীর হাতটা ধরে বলল,— “আমাদের গল্পে নতুন চরিত্র এসেছে, গল্পটা শেষ হয়নি।”
সাথী হেসে বলল,— “বরং আরও বড় হয়েছে।”
সন্তান আসার পর সম্পর্ক বদলায়, কিন্তু যত্ন আর বোঝাপড়া থাকলে সেই পরিবর্তন সম্পর্ককে আরও গভীর করে তোলে।