শেষ আলোর সঙ্গী – সুপ্রিয় রায়

দিনের শেষে সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন তার আলো আর তীব্র থাকে না। কিন্তু সেই কোমল আলোতেই পৃথিবীকে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। মানুষের জীবনও বোধহয় তেমনই। যৌবনের দীপ্তি একদিন ম্লান হয়ে আসে, অথচ সম্পর্ক তখনই তার গভীরতম অর্থ খুঁজে পায়।

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যখন দু’জন মানুষ প্রবীণ বয়সে এসে পাশাপাশি বসেন, তখন তাঁরা আর শুধু স্বামী-স্ত্রী থাকেন না—তাঁরা হয়ে ওঠেন একে অপরের জীবনের সবচেয়ে বড় স্মৃতি, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

এ বয়সে প্রেমের আর কোনো প্রদর্শন থাকে না। থাকে না কাউকে মুগ্ধ করার চেষ্টা। থাকে শুধু একে অপরকে আগলে রাখার এক নিঃশব্দ দায়িত্ব।

তাঁরা জানেন, সামনে পথ আর খুব দীর্ঘ নয়। তাই এখন আর কেউ কাউকে বদলাতে চান না। শুধু চান, যতদিন আছেন, ততদিন পাশাপাশি বসে আকাশের রঙ বদলানো দেখবেন। সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলবে, আর দু’জনের চোখে নীরব কৃতজ্ঞতার আলো ফুটে উঠবে।

বছরের পর বছর একসঙ্গে থাকতে থাকতে তাঁরা বুঝে গেছেন, সুখ মানে সব ইচ্ছে পূরণ হওয়া নয় , সুখ মানে দিনের শেষে একজন আরেকজনকে বলতে পারা—”আমি তোমার পাশে আছি।”

একদিন হয়তো একজন আগে চলে যাবেন। অন্যজন বারান্দার সেই পুরোনো চেয়ারটির দিকে তাকিয়ে বুঝবেন, শূন্যতাও কখনও কখনও উপস্থিতির মতোই সত্য।

তাই প্রবীণ বয়সে একসঙ্গে থাকা মানে শুধু একই ছাদের নিচে বাস করা নয়।
একসঙ্গে থাকা মানে—
একজনের দুর্বলতায় অন্যজনের শক্তি হয়ে ওঠা,
একজনের নীরবতায় অন্যজনের ভাষা হয়ে ওঠা,
আর জীবনের শেষ সূর্যাস্ত পর্যন্ত
হাত ছাড়তে না চাওয়ার এক নিঃশব্দ অঙ্গীকার।

আদর্শ স্বামী-স্ত্রী কখনও নিখুঁত হন না।
তাঁদেরও মতের অমিল থাকে, অভিমান থাকে, ভুল বোঝাবুঝি থাকে।
তবু দিনের শেষে তাঁরা বুঝে যান—
জয়ী হওয়ার চেয়ে, পাশাপাশি থাকাটা অনেক বেশি মূল্যবান।

শেষ পর্যন্ত, সংসার টিকে থাকে বড় বড় প্রতিশ্রুতিতে নয়,
টিকে থাকে প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্নে।

আর সেই যত্নই প্রবীণ বয়সের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে

সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে পরিণত এবং সবচেয়ে অনন্ত করে তোলে।

প্রবীণ বয়সে এসে স্বামী-স্ত্রী আর শুধু দুটি মানুষ নন,
তাঁরা একে অপরের অভ্যাস, আশ্রয়, ইতিহাস।

20 thoughts on “শেষ আলোর সঙ্গী – সুপ্রিয় রায়

  1. Dalia Deb

    দুজন পরিণত মানুষের যুগলবন্দি ….লেখনীতে জীবনের দাম্পত্যের প্রেম…ভালোবাসা…কৃতজ্ঞতা…আবেগ…..অনুরাগ আর সবশেষে পারস্পরিক আশ্রয় বা নির্ভরতা….. একসাথে দেদীপ্যমান……..শেষ টুকু পড়ার পর হয়তো অকারণে অনুভূতির অশ্রু গড়িয়ে পড়ল একফোঁটা….hats off to u lalda…..❤️

    Like

  2. Papia Kargupta

    আমি ঝরণার মতো অতো ভাষা দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারবো না তবে আমি পাপড়ি দির সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত

    লালদা তোর তুলনা তুই নিজে

    Like

  3. Nilangshu Roy

    কি সুন্দর লেখাগুলো। আমার wall এ আপনার নামে নিলে রাগ করবেন? রাগ করলেও নিয়েই নিলাম। দাদা বৌদি দুজনেই ভালো থাকবেন।💖💖💖

    Like

Leave a comment