হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি – সুপ্রিয় রায়

সকালের চা খেতে খেতে সার্থকের মুখে আজ এক রহস্যময় হাসি।

সাথী সন্দেহের চোখে তাকালো ।

— কী ব্যাপার? লটারি পেয়েছ নাকি?

— তার থেকেও বড় খবর!

— কী?

সার্থক মোবাইলটা সামনে ধরলো ।

— দেখো, হোয়াটসঅ্যাপে এসেছে—প্রতিদিন সকালে চারটে কাঁচা লঙ্কা খেলে নাকি একশো বছর পর্যন্ত বাঁচা যায়!

সাথী চায়ের কাপ নামিয়ে বললো ,— কে বলেছে?

— খুব বিশ্বাসযোগ্য একজন।

— কে? ডাক্তার?

— না।

— বিজ্ঞানী?

— না।

— তাহলে?

— আমাদের “সুস্থ জীবন” গ্রুপের হরিহরবাবু।

— যিনি গত মাসে বলেছিলেন নারকেলের জল খেলে মোবাইলের রেডিয়েশন কমে যায়?

— হ্যাঁ, সেই হরিহরবাবুই।

সাথী মাথায় হাত দিলেন।

— তোমার এই হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি কবে বাতিল হবে?

সার্থক প্রতিবাদ করলো ।

— সব খবর মিথ্যে হয় না।

— ঠিকই। কিন্তু সব খবর সত্যিও হয় না।

সেদিন বিকেলে আবার নতুন ঘটনা।

সার্থক খুব উত্তেজিত হয়ে বললো ,— সাথী! তাড়াতাড়ি এসো।

— কী হয়েছে?

— দেখো, এখানে লিখেছে রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস গরম জলে দুই চামচ হলুদ, তিন চামচ মধু, চারটা লবঙ্গ, পাঁচটা তুলসীপাতা মিশিয়ে খেলে সব রোগ সেরে যায়।

— সব রোগ?

— তাই তো লিখেছে।

— তা হলে হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে যায় না কেন?

সার্থক একটু থমকালো ।

— সেটা লেখেনি।

— লেখেনি, কারণ লেখার লোকটাও জানে না।

এরপরও সার্থক পরীক্ষা করে দেখতে চাইলো ।

রাতে সেই মহাঔষধ তৈরি হলো।

এক চুমুক খেয়েই তাঁর মুখ এমন হলো যেন কেউ করলার রসের সঙ্গে নিমপাতা মিশিয়ে দিয়েছে।

সাথী  হেসে বললো ,— কী হলো? সব রোগ সেরে গেল?

— না, তবে জিভের স্বাদটা নিশ্চয়ই চলে গেল।

পরদিন সকালে পাশের ফ্ল্যাটের সৌম্য এল।

দেখল সার্থক মোবাইল হাতে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ছে।

— কাকু, কী দেখছেন?

— খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

— কী তথ্য?

— আগামী সপ্তাহে পৃথিবীতে তিন দিন টানা অন্ধকার থাকবে!

সৌম্য  চমকে উঠল।

— কোথায় লেখা?

— হোয়াটসঅ্যাপে।

সৌম্য  মোবাইলটা নিয়ে একটু খুঁজে দেখল।

তারপর হেসে ফেলল।

— কাকু, এটা পাঁচ বছর আগের ভুয়ো খবর।

সাথী দূর থেকে বললো ,— আমি তো বলেছিলাম।

সার্থক  একটু লজ্জা পেল।

— তা হলে এত লোক ফরোয়ার্ড করল কেন?

সৌম্য  বলল,— ফরোয়ার্ড করা খুব সহজ। যাচাই করা একটু কঠিন।

সেদিন সন্ধ্যায় সাথী  একটা নতুন নিয়ম চালু করলো ।

— আজ থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কোনো খবর পেলে আগে যাচাই করবে।

— কীভাবে?

— একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে দেখবে, সরকারি বা বিশেষজ্ঞ সূত্র দেখবে, তারপর বিশ্বাস করবে।

সার্থক  বললো ,— তা হলে তো অনেক সময় লাগবে।

— ভুল খবর বিশ্বাস করার চেয়ে একটু সময় নেওয়া ভালো।

কয়েকদিন পরে আবার একটি মেসেজ এলো।

লেখা—
“এই বার্তা দশজনকে পাঠালে আগামী সাত দিনে সুখবর পাবেন।”

সার্থক তাড়াতাড়ি সাথীকে ডাকলো ।

— সাথী, এটা পাঠাব?

সাথী বললো ,— না পাঠালেও সুখবর আসতে পারে।

— সত্যি?

— হ্যাঁ। যেমন আজ আমি তোমার প্রিয় লুচি আর আলুর দম বানিয়েছি।

সার্থকের  মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

— এটাই তো সত্যিকারের সুখবর!

— আর সেটা হোয়াটসঅ্যাপ পাঠায়নি।

দু’জনেই হেসে ফেললো ।

রাতে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সার্থক  বললো ,— জানো সাথী, আগে ভাবতাম মোবাইলে যা আসে সবই সত্যি।

— এখন?

— এখন বুঝি, তথ্য অনেক আছে, কিন্তু সব তথ্য জ্ঞান নয়।

সাথী  মুচকি হেসে বললো ,— আর সেই জন্যই মানুষকে শুধু স্মার্টফোন নয়, স্মার্ট মাথাও ব্যবহার করতে হয়।

সার্থক মাথা নেড়ে বললো ,— ঠিক বলেছ। হোয়াটসঅ্যাপ ভালো জিনিস, কিন্তু তাকে বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়ে ফেললে বিপদ।

— আর তুমি তো প্রায় অধ্যাপক হয়ে গিয়েছিলে!

— আর তুমি?

— আমি ছিলাম পরীক্ষক।

— তাহলে আমি পাশ করেছি?

— এখনও রেজাল্ট বেরোয়নি।

আবার শুরু হলো খুনসুটি।

আর সেই হাসির মধ্যেই দু’জনের সন্ধ্যাটা কেটে গেল।

কারণ তারা শিখে গিয়েছে —

প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, কোনো খবর বিশ্বাস করার আগে একটু ভাবা, একটু যাচাই করা আর একটু প্রশ্ন করা—এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে বড় জ্ঞান।

আর জীবনের সবচেয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় হলো, যেখানে মানুষ প্রতিদিন নতুন কিছু শেখে, ভুল থেকে শিক্ষা নেয়, আর হাসতে হাসতে এগিয়ে চলে।

Leave a comment