দুই জার্মান , দুই কোরিয়া ও দুই বাংলা – সুপ্রিয় রায়

আমরা সকলেই জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক কারনে বিজয়ী মিত্রশক্তির দ্বারা জার্মানি বিভক্ত হয় পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানিতে , কোরিয়া বিভক্ত হয় উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াতে আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দ্বারা ভারতের অখণ্ড বাংলা বিভক্ত হয় পূর্ববঙ্গ ( যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ ) ও পশ্চিমবঙ্গে । ভৌগোলিকভাবে এদের  সীমান্ত বিভক্ত হলেও ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রার দিক থেকে এরা ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে সংযুক্ত। আমরা এটাও জানি যে জার্মানির দুই অংশের জনগণ একত্রিত হওয়ার জন্য আন্দোলন করেছিল। আর তার ফলস্বরূপ ১৯৯০ সালের ৩রা অক্টোবর পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানি এক হয়ে একক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলো ।এই ঐতিহাসিক পুনরেকত্রীকরণ শুধু জার্মানির জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল, যা শীতল যুদ্ধের সমাপ্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। হয়ত একটা সময়ে উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার  পুনরেকত্রীকরণ হয়ে যাবে কারণ জার্মানির মতো তাদের প্রধান ভাষা , সংস্কৃতি, ধর্ম , ঐতিহ্য এক এবং বিভক্তির পরও অনেক পরিবারের সদস্যরা দুই অংশে বসবাস করে  এবং সুযোগ পেলেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করে । কিন্তু দুই বাংলার এক হওয়া কোনদিনই সম্ভব হবে না , কারণ সেখানে প্রধান অন্তরায় ধর্ম ।  জার্মান বা কোরিয়ায় বিভাজন ধর্মভিত্তিক ছিল না কিন্তু দুই বাংলার বিভাজনের প্রধান কারণ হোল ধর্মভিত্তিক বিভাজন । অথচ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মধ্যে বিভক্তির পরেও কিছু মৌলিক মিল রয়েছে , এই দুই ভূখণ্ড একই ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও ইতিহাসের অংশীদার। যেমন –

ভাষা ও সাহিত্য:

  • উভয় অঞ্চলের প্রধান ভাষা বাংলা।
  • বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদী ও আধুনিক লেখকদের লেখা দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয়।
  • বাংলা ভাষা আন্দোলন (১৯৫২) বাংলাদেশের হলেও এটি সমগ্র বাংলাভাষীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা।

সংস্কৃতি ও উৎসব:

  • পহেলা বৈশাখ দুই বাংলার অন্যতম প্রধান উৎসব।
  • দুর্গাপূজা, ঈদ, নববর্ষ, বসন্ত উৎসব দুই বাংলাতেই সমানভাবে উদযাপিত হয়।
  • বাউল গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, লোকসংগীত এবং আধুনিক বাংলা গান দুই বাংলাতেই জনপ্রিয়।

খাদ্য ও রন্ধনশৈলী:

  • ভাত, মাছ, ডাল, শুক্তো, পোড়াশাক, পিঠা, রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই— এসব খাবার দুই বাংলাতেই প্রচলিত।
  • বাংলাদেশে ইলিশ জাতীয় মাছ এবং পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘পদ্মার ইলিশ’ নামে পরিচিত।
  • চা পান দুই বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় অভ্যাস।

ঐতিহ্য ও পোশাক:

  • পুরুষদের পাঞ্জাবি এবং নারীদের শাড়ি দুই বাংলাতেই ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
  • জামদানি শাড়ি, কাঁথা স্টিচ, তাঁতের শাড়ি দুই বাংলায় জনপ্রিয়।

 ইতিহাস ও রাজনৈতিক সংযোগ:

  • ১৯৪৭ সালের আগে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ একই ভূখণ্ড ছিল (অখণ্ড বাংলা)।
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে দুই বাংলার জনগনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

৬. চলচ্চিত্র ও বিনোদন:

  • বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের কিংবদন্তি দুই বাংলাতেই সমানভাবে সমাদৃত।
  • টেলিভিশন নাটক, সিনেমা ও ওয়েব সিরিজ দুই বাংলায় জনপ্রিয় ।

৭. নদী ও প্রকৃতি:

  • গঙ্গা ও পদ্মা, মেঘনা ও হুগলি দুই বাংলার প্রধান নদী।
  • সুন্দরবন দুই বাংলার মধ্যেই বিস্তৃত।
  • কৃষি ও গ্রাম্য জীবনধারা প্রায় একই রকম।

যেহেতু ধর্মীয় বিভাজনের কারণে দুই বাংলার মধ্যে রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে , তাই দুই বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিল থাকা স্বতেও তারা এক হতে পারেনি এবং মনে হয় কোনদিন পারবে না । কেননা ধর্ম তাদের এক হতে দেবে না । যদি দুই বাঙলার পুনরেকত্রীকরণ হয়ে একটা রাষ্ট্র হয় , তাহলে মুসলমান জনসংখ্যা, হিন্দু জনসংখ্যার থেকে দ্বিগুণেরও বেশী হয়ে যাবে এবং নতুন রাষ্ট্রটা হয়ে যাবে ইসলামিক রাষ্ট্র যেটা পশ্চিমবঙ্গের বা ভারতবর্ষের হিন্দুরা কোনমতেই চাইবে না সে যতই উদারপন্থী হোক না কেন । তবে দুই বাংলার বেশীরভাগ সাধারণ জনগণের মধ্যে আজও গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে তারা একে অপরের ঘনিষ্ঠ। বিভক্তির পর এখনও অনেক পরিবারের সদস্যরা দুই অংশে বসবাস করে  এবং সুযোগ পেলেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করে ।

Leave a comment