বোঝাপড়ার সংসার – সুপ্রিয় রায়

ছোট্ট এক শহরে থাকত সার্থক  আর সাথী । প্রেম করে নয়, পরিবারের পছন্দে তাদের বিয়ে হয়েছিল। প্রথমদিকে দু’জনেই ভেবেছিল— “এই মানুষটাকে কি সত্যিই আমি বুঝতে পারব?”

সার্থক ছিল একটু চুপচাপ, দায়িত্ববান, সংসারের হিসেব-নিকেশে খুব মনোযোগী। আর সাথী ছিল প্রাণবন্ত, আবেগপ্রবণ, ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে নিতে ভালোবাসত। দু’জনের স্বভাব আলাদা হলেও, এক অদ্ভুত টান ধীরে ধীরে তাদের কাছাকাছি এনে দিল।

বিয়ের কিছুদিন পরেই শুরু হলো বাস্তব সংসার।মাসের শেষে খরচের টান, অফিসের চাপ, বাড়ির ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি— সব মিলিয়ে মাঝেমধ্যে সংসারের আকাশে মেঘ জমত।

একদিন সন্ধ্যায় সাথী অভিমান করে বলল,— “তুমি সবসময় শুধু দায়িত্বের কথা ভাবো, আমার কথা কি একবারও ভাবো না?”

সার্থক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,— “আমি হয়তো তোমার যেরকম শুনতে ভাল লাগে তেমন করে বলতে পারি না, কিন্তু এই সংসারটাকে সুন্দর রাখার জন্যই তো এত দৌড়ঝাঁপ করি।”

সাথী বুঝতে পারল, সার্থকের ভালোবাসা ফুল, চিঠি বা বড় বড় কথায় নয়— দায়িত্বে, চিন্তায় আর নীরব যত্নে লুকিয়ে আছে।

সেদিন থেকে তারা একটা ছোট্ট নিয়ম বানাল।রোজ রাতে যতই কাজ থাকুক, অন্তত পনেরো মিনিট শুধু দু’জনে গল্প করবে। কে কী ভাবছে, কী কষ্ট, কী আনন্দ— সব খুলে বলবে।

ধীরে ধীরে বদলে গেল অনেক কিছু। সার্থক শিখল মাঝে মাঝে সাথীকে “ধন্যবাদ” বলতে, ছোট্ট একটা ফুল এনে দিতে।
সাথীও শিখল, শুধু আবেগ নয়, বাস্তবের লড়াইটাও বোঝা জরুরি।

একদিন খুব ঝড়-বৃষ্টির রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। মোমবাতির আলোয় দু’জনে বসে চা খাচ্ছিল। বাইরে ঝড়, আর ভিতরে শান্ত উষ্ণতা।

সাথী হেসে বলল,— “জানো, সংসারটা বোধহয় এই ঝড়ের মতোই। বাইরে যত সমস্যা থাকুক, ভিতরে যদি আমরা একসাথে থাকি, তাহলে ভয় লাগে না।”

সার্থক মুচকি হেসে উত্তর দিল,— “সংসার টিকে থাকে শুধু ভালোবাসায় নয়, বোঝাপড়া আর বিশ্বাসের উপর। ভালোবাসা তো সেই বাড়ির আলো।”

সাথী সার্থকের হাতটা শক্ত করে ধরল।
সেদিন তারা বুঝেছিল—
সংসার মানে নিখুঁত মানুষ খোঁজা নয়, বরং অসম্পূর্ণ দু’জন মানুষ মিলে একে অপরকে বুঝে নিয়ে সুন্দর একটা জীবন গড়ে তোলা।

ভালোবাসা শুধু “আমি তোমায় ভালোবাসি” বলাতে নয়, বরং “আমি তোমায় বুঝতে চাই” বলাতেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।

Leave a comment