বিকেলের নরম রোদটা তখন সবেমাত্র বারান্দার মেঝেতে এসে লেপ্টে বসেছে।পুরোনো বাড়ির বারান্দা—দেয়ালে খানিকটা চুন খসে পড়েছে, কোণায় রাখা মানিপ্ল্যান্টের টব, আর মাঝখানে পাশাপাশি রাখা দুটো কাঠের চেয়ার।
সার্থক আর সাথী সেখানে পাশাপাশি বসে আছে।সামনে ধোঁয়া ওঠা দু’কাপ দার্জিলিং চা, মাঝখানে একটা টিনের বিস্কুটের কৌটো।
আজ তাদের বিয়ের বয়স প্রায় চল্লিশ বছর।
একসময় এই সংসারটা ছিল একেবারে কোলাহলে ভরা।সকালে মেয়ের স্কুলের জন্য হুড়োহুড়ি, “মা, টিফিনটা কোথায়?”, “বাবা, আমার জুতোর ফিতে বাঁধো তো!”—এইসব ছোট ছোট ডাকেই ভরে থাকত বাড়ি।
তারপর টিউশন, অফিস, বাজার, আত্মীয়-স্বজনের আসা-যাওয়া, উৎসব-পার্বণ—সব মিলিয়ে বাড়িটার যেন নিজস্ব একটা ছন্দ ছিল।
সেই সময়টায় ক্লান্তি ছিল, দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু একাকিত্ব ছিল না।
আর এখন?
মেয়ের বিয়ে হয়েছে অন্য শহরে ।নিজেদের সংসার, নিজেদের ব্যস্ততা।
ফোন আসে, ভিডিও কল হয়, নাতির ছবি/ ভিডিও আসে—সবই হয়।
তবুও, ফোন কেটে গেলে বাড়িটা আবার অদ্ভুত নীরব হয়ে যায়।
বাড়িটা সেই একই আছে,শুধু শব্দগুলো বদলে গেছে।এখন আর সকালে কেউ চেঁচিয়ে বলে না, “মা, দেরি হয়ে যাচ্ছে!”কেউ বই খুঁজে না পেয়ে পুরো ঘর ওলটপালট করে না।”
সাথী চায়ে এক চুমুক দিয়ে হালকা হেসে বললো,— “আচ্ছা, তোমার মনে আছে? আগে আমরা একটু চুপচাপ বসার সময়ই পেতাম না।”
সার্থক কাপটা হাতে নিয়ে দূরে তাকিয়ে বললো,— “হুম… তখন মনে হতো, একদিন যদি একটু নিজেদের জন্য সময় দিতে পারি !”
একটু থেমে আবার বললো,— “আর এখন আমাদের হাতে এত সময় যে, মাঝে মাঝে এই সময়টাকেই কেমন ভারী লাগে।”
দু’জনেই হেসে ফেললো।কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা মিশে ছিল।এক ধরনের ব্যথা, যা শব্দে বলা যায় না—শুধু পাশে বসে থাকা মানুষটা বুঝে নেয়।
সাথীর হাঁটুর ব্যথা ইদানীং বেড়েছে।সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়।আগে যে মানুষটা একসঙ্গে দশটা কাজ সামলাতো, এখন তাকেই মাঝে মাঝে একটু উঠে দাঁড়াতে সময় নিতে হয়।
সার্থকেরও চশমার পাওয়ার অনেক বেড়েছে।রাতে খবরের কাগজ পড়তে গেলে আলোটা আরও কাছে টেনে নিতে হয়।
সময় কাউকে ছাড় দেয় না।আগে যারা সংসারের সবার ওষুধ, খাবার, সময়—সব মনে রাখতো, তাদেরই এখন নিজেদের ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দিতে হয়।
সকালে হাঁটতে বেরোনোর আগে সার্থক বলে যায়,— “তোমার সুগারের ওষুধটা খেয়ে নিও।”
সাথী সঙ্গে সঙ্গে বলে,— “আর তুমি ফিরেই BP-টা মেপে নিও।”
এই ছোট ছোট কথাগুলো শুনলে বাইরে থেকে খুব সাধারণ লাগে।
কিন্তু এই সাধারণতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গভীর প্রেম।যে প্রেমে আর বড় বড় কথা নেই, আছে অভ্যাসে মিশে যাওয়া যত্ন।
একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।পুরো ঘরটা অন্ধকার।জানলা দিয়ে হালকা বাতাস আসছে।দূরে কোথাও জেনারেটরের শব্দ।
অন্ধকারে পাশাপাশি বসে সাথী হঠাৎ বললো,— “জানো, বয়স বাড়ার সবচেয়ে বড় ভয়টা কী?”
সার্থক একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,— “কী?”
সাথীর গলা একটু কেঁপে উঠলো।— “একদিন যদি তোমাকে ছাড়া থাকতে হয়…”
কথাটা বলেই ও চুপ করে গেল।
এই ভয়টা তারা দু’জনেই বহুদিন ধরে চুপচাপ বয়ে বেড়াচ্ছে।
কখনও মুখে আনা হয়নি।সার্থক কিছুক্ষণ কিছু বললো না।
অন্ধকারে শুধু সাথীর হাতটা খুঁজে নিয়ে নিজের হাতে ধরলো।
তারপর ধীরে ধীরে বললো,— “আমিও সেই কথাটাই ভাবি।”
একটু থেমে, খুব নরম গলায় যোগ করলো,— “তাই যতদিন আছি, ততদিন ভালো করে বাঁচতে চাই। তোমার সঙ্গে।”
সাথী মৃদু হেসে বললো,— “তবে তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে এখনও ভালো লাগে।”
সার্থক হেসে উঠলো,— “তা না হলে তো সংসারটা একঘেয়ে হয়ে যাবে!”
আবার হাসি।এই হাসিটা একটু অন্যরকম।যেন বহু বছরের সঙ্গ, ঝগড়া, মান-অভিমান, মিলনের সারাংশ।দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে দু’জনেই যেন নিজেদের জীবনটাকে নতুন করে দেখতে লাগলো।
একটা ছবিতে নবদম্পতি—চোখে স্বপ্ন, মুখে লাজুক হাসি।আরেকটায় মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাথী। আরেকটায় পুরো পরিবার, পুজোর নতুন জামা পরে।
কত ঝড় গেছে জীবনে।অর্থকষ্ট, EMI, সন্তান মানুষ করা, অসুস্থতা, ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান, না বলা কষ্ট—সবই ছিল।কখনও মনে হয়েছে, আর পারবে না।তবু পরের দিন আবার একসঙ্গে চা খেয়েছে।আবার কথা বলেছে।আবার পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে।
হয়তো প্রেমের বড় সংজ্ঞা নেই।শুধু প্রতিদিন একটু একটু করে একে অপরকে বেছে নেওয়া।
রাত ধীরে ধীরে নেমে আসছিল।
সার্থক উঠে দাঁড়িয়ে বললো,— “চলো, ওষুধ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে।”
সাথী হেসে বললো,— “এই বয়সে প্রেম মানে বুঝি ওষুধ খেতে মনে করিয়ে দেওয়া?”
সার্থকও হেসে উত্তর দিল,— “না… এই বয়সে প্রেম মানে— তুমি আছো জেনেই নিশ্চিন্ত থাকা।”
সাথী কিছু বললো না।শুধু ধীরে ধীরে সার্থকের হাতটা আরও শক্ত করে ধরলো।চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল। সেটা দুঃখের জল নয়,
বরং একসঙ্গে এতটা পথ পেরিয়ে আসার গভীর কৃতজ্ঞতা।
ওষুধ খেয়ে সার্থক আর সাথী ঘরে ঢুকলো।সাথী আলমারির ড্রয়ার খুলে কিছু একটা খুঁজছিল।হঠাৎ একটা পুরোনো নীল কাপড়ের ফাইল নিচে পড়ে গেল।সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা পুরোনো ছবি আর হলদেটে কাগজ মেঝেতে ছড়িয়ে পড়লো।
সার্থক অবাক হয়ে বললো,— “আরে! এগুলো এখনও রেখেছ?”
সাথী নিচু হয়ে একটা কাগজ হাতে তুলে নিয়ে হেসে বললো,— “ফেলে দিতে পারিনি।”
সার্থক চশমাটা ঠিক করে কাগজটার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো।
— “এটা তো আমার লেখা!”
সেটা ছিল বহু বছরের পুরোনো একটা চিঠি।বিয়ের আগে, যখন ফোন এত সহজ ছিল না, তখন সার্থক সাথীকে লিখেছিল।কাগজটা সময়ের সঙ্গে একটু ভাঁজ পড়ে গেছে, কালিও খানিকটা ঝাপসা।
তবু শব্দগুলো এখনও স্পষ্ট।
সাথী ধীরে ধীরে পড়ে শোনাতে লাগলো—
— “প্রিয় সাথী,
জীবনে কতটা সুখ দিতে পারবো জানি না।
কিন্তু একটা কথা দিতে পারি, যতদিন বাঁচবো, তোমার পাশে থাকার চেষ্টা করবো…”
পড়তে পড়তে সাথীর গলা কেঁপে গেল।
সার্থক মৃদু হেসে বললো,— “দেখো, অন্তত এই প্রতিশ্রুতিটা রাখতে পেরেছি।”
সাথী চোখ তুলে তাকালো।চোখদুটো ভিজে উঠেছে।
— “হ্যাঁ… রেখেছ।”
ঠিক তখনই হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।ভিডিও কল।
সাথী তাড়াতাড়ি চোখ মুছে ফোনটা ধরলো।
ওপাশে মেয়ে , জামাই আর ছোট্ট নাতি হাত নেড়ে চেঁচিয়ে বলছে,
— “ঠাম্মি! দাদু!”
মুহূর্তের মধ্যে ঘরটা যেন আবার একটু জীবন্ত হয়ে উঠলো।
নাতি স্ক্রিনের দিকে মুখ বাড়িয়ে বললো,— “দাদু, তুমি কাঁদছ নাকি?”
সার্থক হেসে বললো,— “না রে, চোখে একটু ধুলো গেছে।”
সবাই হেসে উঠলো।
কিছুক্ষণ গল্প হলো।কে কী খেলো, স্কুলে কী হলো, আগামী Puja-তে আসার পরিকল্পনা—সব কথা।
কলটা কেটে যাওয়ার পর আবার ঘরে নীরবতা নেমে এলো।কিন্তু এই নীরবতা আর আগের মতো ফাঁকা লাগছিল না।
সাথী পুরোনো চিঠিটা হাতে নিয়ে বললো,— “জানো, বয়স বাড়লে মানুষ আসলে স্মৃতির ভেতরেও বাঁচতে শেখে।”
সার্থক উত্তর দিল,— “আর স্মৃতিগুলো সুন্দর হয়, যদি পাশে ঠিক মানুষটা থাকে।”
সাথী ধীরে ধীরে মাথাটা সার্থকের কাঁধে রাখলো।
দু’জনেই কিছু বললো না।কথার আর প্রয়োজনও ছিল না।দেয়ালে ঘড়ির টিকটিক শব্দ, বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর ভেতরে দুটো মানুষের দীর্ঘ জীবনের নীরব বোঝাপড়া।
ভালোবাসা সবসময় বড় বড় কথায় প্রকাশ পায় না।কখনও সেটা একটা পুরোনো চিঠিতে লুকিয়ে থাকে,কখনও ভিডিও কলে নাতির হাসিতে,
আর কখনও শুধু পাশাপাশি বসে থাকার নিশ্চিন্ত নীরবতায়।
সময় তাদের চুলে পাকা রং লাগিয়েছে, শরীরে ক্লান্তি এনেছে,
কিন্তু ভালোবাসাকে আরও নরম, আরও গভীর, আরও সত্যি করে দিয়েছে।