সার্থক আজ অফিসে তার কর্মজীবনের শেষ দিন কাটিয়ে বাড়ি ফিরলো ।
চল্লিশ বছরের চাকরি জীবনের পর অবসর।অফিস থেকে ফেরার সময় সহকর্মীরা ফুল, শুভেচ্ছা আর স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে বিদায় জানিয়েছে।
সবাই বলেছে,— “এবার আরাম করুন, নিজের জন্য সময় দিন।”
কিন্তু বাড়ি ফিরে সার্থকের কেমন যেন শূন্য লাগছিল।সারাদিন কিভাবে সময় কাটাবে এটাই ছিল সার্থকের একমাত্র চিন্তা ।
এতদিন সকাল মানেই ছিল তাড়াহুড়ো—অ্যালার্ম, চা, খবরের কাগজ, অফিসের ব্যাগ।
কিন্ত্যু কাল সকাল থেকে আর এগুলোর কিছুই থাকবে না ।এত বছর ধরে যে জীবনটায় সে ধাতস্ত হয়ে গেছিল এবার থেকে তার থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে ।
রাতে খেতে বসে তার স্ত্রীকে সে বলল ,— “জানো সাথী , কাল থেকে মনে হচ্ছে আমি একটু অপ্রয়োজনীয় হয়ে যাব।”
সাথী হেসে বলল,— “চল্লিশ বছর অফিসকে সময় দিয়েছ, এবার একটু আমাকে দাও।”
সার্থক হালকা হেসে চুপ করে গেল।
পরদিন সকাল।
অভ্যাসবশত সে খুব ভোরেই উঠে পড়ল।
তারপর মনে পড়ল— কোথাও যাওয়ার নেই।
বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে দেখল, সাথী গাছগুলোতে জল দিচ্ছে।
— “এত গাছ কবে করলে?”
সাথী অবাক হয়ে বলল,— “অনেকদিন হলো। তুমি শুধু খেয়াল করার সময় পাওনি।”
কথাটা শুনে সার্থক একটু থমকে গেল।সত্যিই তো।সংসার, স্ত্রী, নিজের ঘর— সব ছিল, কিন্তু সে যেন সবকিছুর মাঝেও ব্যস্ত ছিল।
ধীরে ধীরে নতুন জীবন শুরু হলো।
সকালবেলা দু’জনে একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া।বাজার করা।মাঝে মাঝে একসঙ্গে রান্না করা।
একদিন সাথী বলল,— “চলো না, এতদিন পরে এবার লম্বা কোথাও ঘুরে আসি।”এতদিন তো ছুটির ঝামেলা ছিল । এখন তো তুমি স্বাধীন ।
সার্থক হেসে বলল,— “তুমি তো দেখছি অনেক প্ল্যান করে রেখেছ!”
— “তুমি শুধু সময় দাওনি, প্ল্যান তো ছিলই।”
দু’জনেই হেসে ফেলল।
অবসরের কয়েক মাস পর সার্থক বুঝল, জীবনটা শেষ হয়নি— শুধু ছন্দ বদলেছে।
এখন আর অফিসের deadline নেই, কিন্তু আছে একসঙ্গে সকালের জল খাবার খাওয়ার সময়।
আছে পুরনো অ্যালবাম দেখে গল্প করা।
আছে সন্ধ্যায় ছাদে হাঁটতে হাঁটতে পুরনো দিনের কথা মনে করা।
একদিন সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সার্থক বলল,
— “জানো, অবসর নেওয়ার আগে খুব ভয় লাগছিল।”
সাথী জিজ্ঞেস করল,— “এখন?”
— “এখন মনে হচ্ছে, আমি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি, জীবন থেকে নয়।”
সাথী মৃদু হেসে বলল,— “বরং এখন আমাদের সম্পর্কটাই নতুন চাকরি পেয়েছে।”
সার্থক হেসে উঠল।বয়স বাড়লে জীবনের গতি একটু ধীর হয় ঠিকই কিন্তু সেই ধীর গতির মধ্যেই অনেক অদেখা সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে।
অবসর মানে জীবন শেষ নয় বরং বলা যায় বহুদিন পর নিজের মানুষটার সঙ্গে আবার নতুন করে পরিচয় হওয়া।
অবসরের পর সময় ফাঁকা হয়ে যায় না, বরং সময় নতুন অর্থে ও নতুন আনন্দে ভরে ওঠে। দীর্ঘ কর্মজীবনের ব্যস্ততার কারণে যে স্বপ্ন, শখ আর ইচ্ছাগুলো মনের কোণে অপেক্ষা করে থাকে, অবসর সেইসবকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলার সুযোগ এনে দেয়। এ সময় মানুষ নিজের ভালো লাগার কাজগুলো করতে পারে, নতুন কিছু শিখতে পারে, সৃজনশীলতাকে বিকশিত করতে পারে এবং বহুদিনের অপূর্ণ ইচ্ছাগুলো পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারে। তাই অবসর জীবনের শেষ অধ্যায় নয়, বরং নিজের মতো করে বাঁচার এক নতুন সূচনা।