এটা আমার বাড়ি – সুপ্রিয় রায়

এই একটা বাক্যই জীবনের গভীরে গাঁথা বহু অর্থ বহন করে। এই “নিজের বাড়ি” শব্দটা আমাদের আত্মপরিচয়ের, নিরাপত্তার, ভালোবাসার এবং প্রাপ্যতার চিহ্ন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কাকে আমরা নিজের বাড়ি বলি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—সন্তানদের বাড়িকে বাবা-মা নিজের বাড়ি বলে কেন মনে করতে পারেন না?

ছেলে বা মেয়ে যখন মা-বাবার কাছে থাকে, তখন সে গর্ব করে বলে, “এটা আমার বাড়ি”।
সত্যিই তো—সেই ছাদের তলায়, বাবা-মার সাথে , ভালোবাসায়, শাসনে, নিরাপত্তায় সে বেড়ে উঠেছে। সেই ঘর, সেই বারান্দা, সেই দুপুরবেলা, সেই গল্পের রাতগুলো—সবই তো তার নিজের।অবশ্যই সেটা তাদের নিজের বাড়ি ।

কিন্তু যখন সন্তান বড় হয়, সংসার গড়ে, তখন বাড়ির ঠিকানা বদলায়।
সেই নতুন বাড়িকেই সে বলতে শুরু করে—এটাই এখন আমার বাড়ি, আগের বাড়িকে বলে পৈতৃক বাড়ি ।”

সন্তান যখন নিজস্ব সংসার গড়ে, তখন মা-বাবা কি তখন পর হয়ে যান?
কেন যেন সমাজের অলিখিত নিয়ম হয়ে গেছে—সন্তানদের বাড়ি, বাবা-মার নয়
মেয়ে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে গেলে, তার মা-বাবা যেন “অতিথি” হয়ে যান।মেয়েকেও বলতে শোনা যায় ওটা আমার বাপের বাড়ি ।
ছেলে নিজের সংসার করলে, বাবা-মা যেন “সাবেক কর্তা”, এখন শুধু অতিথি বা “থাকার জায়গা পাওয়া বয়স্ক মানুষ”।

অথচ, যাদের শ্রমে, ঘামে, স্বপ্নে এবং ত্যাগে সেই সন্তানের ভিত্তি তৈরি—তাঁরাই যদি বলেন, “এই বাড়ি আমারও”—তবে সমাজ কেমন যেন মুখ বাঁকায়!

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে—

  • বয়স বাড়লে মানুষ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়,
  • সন্তান বড় হলে বাবা-মা “অবসরে” চলে যান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও,
  • নিজের মানসিক শান্তির কথা বলতে গেলে বলা হয়, “তুমি এখন বোঝা হয়ে যাচ্ছ”।

এটাই কি আমাদের পরিবার? আমাদের মূল্যবোধ?

একটা বাড়ি কেবল দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে তৈরি হয় না।
তা তৈরি হয় স্মৃতি দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, একসাথে থাকা দিয়ে।

তাই যদি একটা বাড়ি তৈরি হয় একজন সন্তানের হাতে, তবুও সেই বাড়ি ততটাই বাবা-মারও, যতটা সন্তানের।

আমরা যদি সত্যিকারের পরিবার গড়তে চাই—তাহলে সেই ঘরে সবার সমান স্থান থাকা উচিত।
বাবা-মা যেন বলতে পারেন—“এই বাড়ি আমারও।”
সন্তান যেন গর্ব করে বলে—“হ্যাঁ, আপনি তো এই ঘরেরই হৃদয়।”

নিজের বাড়ি কি শুধু মালিকানার কাগজে লেখা থাকে? নাকি যেখানে মনের স্বাধীনতা থাকে, সেটাই আসল বাড়ি?

ছেলে-মেয়েরা নিজের সংসারকে যখন আমার বাড়ি” বলে, তখন সেটা সমাজে স্বীকৃত। কিন্তু বাবা-মা যখন সেই একই বাড়িকে আমার বাড়ি” বলেন, তখন সেটা অনেক সময় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না। অথচ, ভালোবাসা আর সম্পর্কের চোখে দেখলে—বাবা-মার থেকেও বেশি ‘নিজের’ আর কেউ নয়।

Leave a comment