যৌথ পরিবার বনাম ছোট পরিবার: সুখ কোথায় বেশি?- সুপ্রিয় রায়

একবার এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করা হলো,— “আপনি যৌথ পরিবার পছন্দ করেন, না ছোট পরিবার?”

ভদ্রলোক একটু ভেবে হেসে বললেন,— “মাসের প্রথম সপ্তাহে যৌথ পরিবার, আর মাসের শেষ সপ্তাহে ছোট পরিবার!”

কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠলেও এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাস্তবতার একটা বড় সত্য। কারণ দুই ধরনের পরিবারেরই কিছু সুবিধা আছে, আবার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে।

কয়েকদিন আগে এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়িতে ঢুকতেই মনে হলো যেন একসঙ্গে অনেকগুলো গল্প চলছে।

দাদু খবরের কাগজ পড়তে পড়তে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত।

ঠাকুমা নাতিকে ভাত খাওয়ানোর জন্য যেন ছোটখাটো যুদ্ধ করছেন।

কাকিমা রান্নাঘর থেকে কাউকে ডাকছেন।

আর পাশের ঘর থেকে টিভির আওয়াজ এমনভাবে ভেসে আসছে, যেন পুরো পাড়ার মানুষ একসঙ্গে অনুষ্ঠান দেখছে!

আমি হেসে বন্ধুকে বললাম,— “তোদের বাড়িটা তো একেবারে ছোটখাটো সংসদ!”

বন্ধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— “তুই একদিন এখানে থাক, তারপর বুঝবি সংসদ আর যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে পার্থক্য কতটা কম!”

সবাই হেসেছিল। কিন্তু হাসির আড়ালেও একটা সত্যি লুকিয়ে আছে। অনেক যৌথ পরিবারের ছবিটা এমনই—হইচই আছে, প্রাণ আছে, মতভেদ আছে, আবার কখনও মনোমালিন্যও আছে।

অন্যদিকে আমার আরেক বন্ধু থাকে ছোট পরিবারে। সে একদিন মজা করে বলল,— “আমাদের বাড়িতে এত শান্তি যে মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা বাড়িতে না, লাইব্রেরিতে থাকি!”

তাহলে প্রশ্ন হলো—যৌথ পরিবার ভালো, না ছোট পরিবার?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা এমন—”মিষ্টির মধ্যে রসগোল্লা ভালো, না সন্দেশ?”

কেউ রসগোল্লা ভালোবাসেন, কেউ সন্দেশ। কিন্তু দুটোই তো মিষ্টি।

ঠিক তেমনই, যৌথ পরিবার আর ছোট পরিবার—দুটোরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।

যৌথ পরিবারের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো একসঙ্গে থাকার অনুভূতি। সুখ-দুঃখ, উৎসব-অনুষ্ঠান, বিপদ-আপদ—সবকিছু ভাগ করে নেওয়ার মানুষ থাকে। একজন অসুস্থ হলে অন্যজন পাশে দাঁড়ায়, বাচ্চারা বড়দের সান্নিধ্যে বড় হয়, আর প্রবীণরাও একাকীত্বে ভোগেন না।

তবে সব সময় যে সবকিছু সহজ হয়, তা নয়। অনেক মানুষের ভিন্ন মত, ভিন্ন অভ্যাস, ভিন্ন প্রত্যাশা—এসব সামলাতে গিয়ে কখনও কখনও জটিলতাও তৈরি হয়।

অন্যদিকে ছোট পরিবারের সুবিধা হলো স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পরিসর। সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, দায়িত্ব নির্দিষ্ট, জীবনযাত্রাও অনেক ক্ষেত্রে সরল হয়।

কিন্তু কখনও কখনও সেই স্বাধীনতার মাঝেও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা এসে যায়। বিশেষ করে বিপদের সময় বা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই কাছের মানুষের অভাব অনুভব করেন।

তাই আসল প্রশ্ন পরিবার বড় না ছোট—সেটা নয়।

আসল প্রশ্ন হলো—সেখানে কি পারস্পরিক সম্মান আছে? সেখানে কি ভালোবাসা আছে? সেখানে কি একজনের বিপদে আরেকজন নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়?

যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে সেই পরিবারই সুখী পরিবার।

যৌথ পরিবার আমাদের শেখায়—”আমরা” শব্দের শক্তি।

আর ছোট পরিবার শেখায়—আত্মনির্ভরতা, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত দায়িত্বের মূল্য।

দুটোরই প্রয়োজন আছে, দুটোরই গুরুত্ব আছে।

দিনের শেষে মানুষ বড় বাড়ি খোঁজে না, খোঁজে এমন একটি ঘর যেখানে ফিরে এসে মনে হয়— “এরা আমার নিজের মানুষ। এরা আমার সবচেয়ে আপন।”

যৌথ পরিবারে কখনও কখনও নিজের জন্য একটু নিরিবিলি জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়।

আর ছোট পরিবারে কখনও কখনও নিজের মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

একটিতে মানুষের ভিড়, অন্যটিতে নীরবতার ভিড়।

তাই সুখ আসলে ভিড়ে নয়, নীরবতাতেও নয়।

সুখ থাকে সম্পর্কের উষ্ণতায়, একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় এবং পাশে থাকার মানসিকতায়।

সেটা যৌথ পরিবারেও পাওয়া যায়, আবার ছোট পরিবারেও।

কারণ পরিবারের আসল পরিচয় তার আকারে নয়, তার মানুষের হৃদয়ের আকারে।

পরিবারের সুখ সদস্যসংখ্যা গুনে মাপা যায় না। সুখ মাপা যায় কতজন মানুষ একে অপরের জন্য হৃদয়ের দরজা খোলা রাখে, তার ওপর।

Leave a comment