সাত মাসের ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটি আমাদের সহেলি।
আজ সকাল থেকেই যেন ওকে একটু অন্যরকম লাগছে। যে সহেলি প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই হাসতে হাসতে হাত-পা ছুঁড়ে দেয়, সবার মুখ দেখে খিলখিলিয়ে ওঠে, আজ সে কেমন যেন চুপচাপ।
সকাল থেকে একের পর এক নিকট আত্মিয়রা ওকে দেখতে আসছে। সবাই তাকে কোলে নিচ্ছে, আদর করছে, ছবি তুলছে। কিন্তু সহেলি আজ আর সেভাবে হাসছে না। বড় বড় দুটি বিস্মিত চোখে শুধু চারপাশটা দেখছে।
মুখে সেই চেনা, নিষ্পাপ হাসিটা নেই। আজ যে তার বিদেশে চলে যাওয়ার দিন।
বাবা-মা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। স্যুটকেস গুছিয়ে রাখা হয়েছে, দরকারি কাগজপত্র বারবার দেখে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও ঘরের মধ্যে বসে থাকা দাদু আর ঠাকুমার মনটা কেমন যেন খালি খালি হয়ে আছে।
গত দেড় মাস ধরে সহেলি শুধু একটি শিশু হয়ে থাকেনি, সে যেন এই বাড়ির প্রাণ হয়ে উঠেছিল । ভোরবেলার ঘুমভাঙা হাসি, আধো আধো “আ-উ” শব্দ, ছোট্ট হাত দিয়ে ঠাকুমার গলার চেন টেনে ধরা, দাদুর কোলে উঠে ঘরময় ঘুরে বেড়ানো—এসব দিয়েই সে অজান্তে সবার হৃদয়ের গভীরে নিজের জন্য একটি স্থায়ী জায়গা বানিয়ে নিয়েছিল ।
সহেলি এখনও কথা বলতে শেখেনি। স্মৃতির মানে কী, সেটাও সে বোঝে না। তবুও আজ যেন তার ভেতরেও কিছু একটা বদল ঘটছিল ।
কখনও কখনও শিশুরা এমন কিছু অনুভব করে, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। হয়তো তারাও বুঝতে পারে, চারপাশে কিছু একটা বদলে যাচ্ছে।
ঠাকুমা তাকে কোলে তুলে নিলেন।
মুখটা নিজের মুখের কাছে এনে মৃদু স্বরে বললেন,— “কি রে মা, আজ এত চুপচাপ কেন?”
সহেলি কোনো উত্তর দিল না। শুধু একদৃষ্টে ঠাকুমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে নিজের ছোট্ট নরম হাতটা বাড়িয়ে ঠাকুমার গাল ছুঁয়ে দিল।
সেই স্পর্শে যেন হাজার কথার চেয়েও বেশি কিছু ছিল।
ঠাকুমার চোখ মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন, যাতে কেউ তার চোখের জল দেখতে না পায়।
বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সময়টা আরও কঠিন হয়ে উঠল। ঘড়ির কাঁটা যেন একটু বেশিই দ্রুত চলছিল। যে মুহূর্তটাকে সবাই এড়িয়ে যেতে চাইছিল, সেটাই ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল।
দাদু সহেলিকে কোলে নিলেন।কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে রইলেন ওর মুখের দিকে।
তারপর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বললেন,— “ভালো থাকিস দিদিভাই।”
ঠাকুমা ওর দুই গালে চুমু খেয়ে বললেন,— “অনেক অনেক আনন্দে থাকিস মা।”
সহেলি তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎ করে “আ… উ… আ…” করে কী যেন বলতে লাগল।
কেউ তার ভাষা বুঝল না।
কিন্তু দাদুর বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
মনে হলো, যেন সে বলছে—”দাদু, আমি তো এখনও ছোট। কথা বলতে পারি না। কিন্তু ঠাকুমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া, তোমার আদরে চোখ বুজে আসা, তোমাদের মুখ দেখে হেসে ওঠা—এসব কি সত্যিই কোথাও হারিয়ে যায়?”
তারপর সময় এল ভেতরে যাওয়ার।
বাবা-মা সহেলিকে নিয়ে বিমানবন্দরের কাঁচের দরজার ওপারে চলে গেল।
এপারে দাঁড়িয়ে রইলেন দাদু আর ঠাকুমা। দু’জনের হাত এখনও নড়ছে। আশীর্বাদের হাত নাড়া। ভালোবাসার হাত নাড়া।
ঠিক তখনই সহেলি হঠাৎ পিছন ফিরে তাকাল। দাদু-ঠাকুমাকে দেখতে পেল কি না, কে জানে! তবুও সে আবার বলল—”আ… উ…”
তারপর কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।
সেই ছোট্ট চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে দাদুর মনে হলো—হয়তো সে বুঝতে পারছে না যে আজ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু ভালোবাসা যে তাকে ঘিরে রেখেছে, সেই অনুভূতিটা হয়তো সে ঠিকই অনুভব করছে।
বিজ্ঞান বলে, সাত মাসের শিশুর হয়তো এই দিনের কোনো স্মৃতি বড় হয়ে মনে থাকবে না। বিমানবন্দরের এই মুহূর্ত , এই চোখের জল, এই কষ্ট—সবই হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাবে।
কিন্তু ভালোবাসা কি শুধুই স্মৃতির ওপর নির্ভর করে?
যে শিশু জন্মের আগেই মায়ের কণ্ঠস্বর চিনে নেয়, সে কি আদরের স্পর্শ চিনতে পারে না?
যে শিশু বুকের কাছে মাথা রাখলে নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, সে কি নিরাপদ ভালোবাসার অনুভূতি নিজের ভেতরে সঞ্চয় করে রাখে না?
হয়তো বড় হয়ে সহেলি এই দিনটার কথা মনে করতে পারবে না।কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরে কোথাও একটি অদৃশ্য উষ্ণতা থেকে যাবে।একটি গভীর নিশ্চয়তা।
যে পৃথিবীর এক কোণে দু’জন মানুষ আছে, যারা তার জন্য নিঃস্বার্থভাবে অপেক্ষা করে।
যারা তার হাসিতে বাঁচে। তার কান্নায় কষ্ট পায় এবং তাকে ভালোবাসার জন্য কোনো কারণ খোঁজে না।
সিকিউরিটি চেক হওয়ার খবর পাওয়ার পর দাদু আর ঠাকুমা বাড়ি ফিরলেন।
ঘরটা অদ্ভুত নীরব।
যে ঘরে সারাদিন সহেলির হাসি ভেসে বেড়াত, সেখানে আজ শুধু নীরবতা।
খাটের এক কোণে পড়ে আছে তার প্রিয় খেলনার ছোট্ট হাতিটা।
ঠাকুমা সেটি হাতে তুলে নিলেন।বুকের কাছে চেপে ধরলেন।
ঠিক তখনই দাদুর মোবাইল বেজে উঠল। ভিডিও কল।
পর্দা জুড়ে ভেসে উঠল সহেলির মুখ। বিমানের সিটে বসে সে আবার হাসছে। সেই চেনা, উজ্জ্বল, নিষ্পাপ, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। মনে হলো যেন কিছুই হয়নি।
ঠাকুমা চোখ মুছে হেসে বললেন,
— “দেখো তো, আমাদের আদরের নাতনিটা আবার হাসছে!”
দাদুও হেসে উঠলেন।
তারপর ধীর স্বরে বললেন,— “হাসবেই তো… ভালোবাসার মানুষ দূরে যায়, কিন্তু ভালোবাসা কখনও দূরে যায় না।”
সেদিন পৃথিবীর দুই প্রান্তে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্পর্কের সুতোটা আরও শক্ত হয়ে বাঁধা পড়েছিল। আর সহেলির সেই ছোট্ট “আ-উ” শব্দ যেন আকাশ, মেঘ আর সমুদ্র পেরিয়ে কানে ভেসে আসছিল —
“দাদু… ঠাকুমা… আমি দূরে যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তোমাদের ভালোবাসা নিয়েই যাচ্ছি। আর তোমাদের হৃদয়ের ভেতরেই রয়ে যাচ্ছি চিরদিন…”
Krishnasis Chatterjee
সুন্দর লেখা
LikeLike
Bani Paul
Tomar lekhar prtita line upolobdhi korte parchhi…
LikeLike
Tapas Banerjee
লেখা টা মন ছুয়ে গেলো
LikeLike
Tapashi Banerjee
এ এক অনুভূতি। লেখাটা পড়ে চোখে জল এসে গেল।
LikeLike
Debabrata Mukherjee
Kon lekha ta mon chuye jaye na ,
LikeLike
Shibani Roychowdhury
মনের ভেতরে যে আনন্দ হয়েছে সেটা ছবিতে স্পস্ট।ভালো থেকো। পুচকেটাকে আমার অনেক আদর ও ভালবাসা
LikeLike
Naru Mahato
সুন্দর অনুভূতি কে জীবন্ত ভাবে ব্যক্ত করেছেন। খুব ভালো লাগলো।
LikeLike
Tamasree Chatterjee
Khub khub misti sona buri…khub sundar
LikeLike
Tanima Goswami
Ashadharan ashadharan.Tomar lekha ta pore chokhe jol alo.
LikeLike
Dalia Deb
Ghor faka hoe galo
…..valo thakuk sustho thakuk sonata mamma papar sathe







LikeLike
Chaitalee Roy
Sotti Lalda kandiye dile
Sob Dadu Thakuma o Dida r aeirokomi fillings hoy bujhte parchi
mone hoy sara prithibi ta e oder modhe
Valo thakur sob o sabar bacchara sukhe thakuk ora
LikeLike
Kanika Dasgupta
Dadar chotto sohelike niye lekha pore mon kharap hoye galo .valo thakis lipi tora
LikeLike
Anindita Majumdar
Dada lekhata pore sokal sokal chokhe jol chole elo,ki misti amader natni sona…satti bachhara bari theke dure gale khub kosto hoy,e to abar bidesh e,onekdin por por dyakha hobe..
LikeLike
Sukhendu Ray
খুব সুন্দর পরিবার। বাবা, মা, ছেলে, বৌমা ও নাতনি সহ। দেখেও ভালো লাগছে। বাচ্ছাটা সুস্থ থাকুক এই আশা রাখি।
LikeLike
Chandana Banerjee
সত্যি ভালবাসা কোনোদিন দূরত্বের অপেক্ষা রাখেনা। ছোট্ট সহেলিকে কে অনেক আদর। লেখাটি মন ছুয়ে গেলো
LikeLike
Anindita Majumdar
Maya katano khub e kosto…apnara sobai bhalo thakun..
LikeLike
Biman Kumar Chatterjee
লেখা টা বেশ ভালো হয়েছে। বোঝা গেল নাতি-নাতনী হলো “Interest on Investment”. বিদায় বেলায় মনটাকে একটু ” মোচর ” দিয়ে যায়।
LikeLike
Aparna Mukherjee
Lekha ta pore chokher jal elo. Abeg e apluto holam.
LikeLike
Swapan Kumar
মায়ার পুঁটুলি।ভাল থাকবেন সবাই।
LikeLike
Mini R Saha
Parting from our dear ones is always painful………..
LikeLike
Prokash Bhowmick
Apurba sundar chhabigulo dekhe khub bhalo laglo Biday muhurter barnana y moner bhaber asamanya prakash Abegpurna lekha monke gabhir bhabe nara diye gelo Nijeo abegpraban hoye parlam Bastab ke mene nite hochchhe
LikeLike