“দলবদল উৎসব” নাকি গণতন্ত্রের ট্রান্সফার মার্কেট? – সুপ্রিয় রায়

সম্প্রতি দেখলাম— দলবদল আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আপ দলের ১০ জন রাজ্যসভার সাংসদের মধ্যে ৭ জন হঠাৎ বিজেপিতে যোগ দিলেন। এছাড়া আমাদের দেশে বিধানসভা নির্বাচনের পর দলবদল (defection) নতুন কিছু নয়—বরং বহু রাজ্যেই এটা বারবার দেখা গেছে। যেমন –

১. অরুণাচল প্রদেশ রাজনৈতিক সংকট ২০১৬- এখানেও ব্যাপক দলবদলের ফলে সরকার একাধিকবার বদল হয়।

২. গোয়া বিধানসভা নির্বাচন ২০১৭ – কংগ্রেস বেশি আসন পেলেও, পরে একাধিক বিধায়ক দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দেন, ফলে বিজেপি সরকার টিকে যায়।

৩. কর্ণাটক বিধানসভা ২০১৮ নির্বাচনের পর – কংগ্রেস–জেডিএস জোট সরকার গঠন করেছিল। পরে কয়েকজন বিধায়ক দলবদল করায় সরকার পড়ে যায় এবং বিএস ইয়েদিয়ুরাপ্পা-র নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করে।

৪. মধ্যপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন ২০১৮ – কংগ্রেস সরকার গঠন করলেও, ২০২০ সালে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া-র সমর্থক বহু বিধায়ক দলবদল করেন। ফলে কমল নাথ সরকারের পতন ঘটে এবং বিজেপি ক্ষমতায় আসে।

৫. মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচন ২০১৯- নির্বাচনের পর শিবসেনা, কংগ্রেস ও এনসিপি মিলে সরকার গঠন করে। কিন্তু ২০২২ সালে একনাথ শিন্ডে-র নেতৃত্বে শিবসেনার বড় অংশ দলবদল করলে সরকার ভেঙে যায়।

তাহলে কি দাঁড়ালো – আইন? আদর্শ? ভোটারদের বিশ্বাস?—সবকিছুকেই যেন বিনা নোটিশে অবসর দেওয়া হল!

এখনকার রাজনৈতিক নেতাদের দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়—এরা আর নেতা নন, এরা যেন ট্রান্সফার মার্কেটের স্টার প্লেয়ার!

আজ এই দলে, কাল ওই দলে—একেবারে ফুটবল ক্লাব বদলের মতো!

পার্থক্য শুধু একটাই — ফুটবল খেলোয়াড়রা অন্তত গোল দিতে মাঠে নামে, আর এরা গোল পাকাতে মাঠে নামে!

কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায় — আমরা যাকে ভোট দিয়ে জেতাচ্ছি , তিনি যদি হঠাৎ নিজের মত বদলে অন্য দলে চলে যান, তাহলে কি সেটা আমাদের ভোটের অপমান নয়?

আমরা যারা সাধারণ ভোটার বা এই দেশের নাগরিক তারা প্রায় সবাই চাই এই “দলবদল উৎসব” বন্ধ হোক । কিন্তু কিছু মুষ্টিমেয় স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতাদের জন্য এটা হচ্ছে না । আচ্ছা যদি এমন হতো —

১. প্রত্যেক নেতার গায়ে একটা স্টিকার লাগানো থাকতো —“এই নেতা আগামী ৫ বছর দল পরিবর্তন করতে পারবেন না।”

যেমন দুধের প্যাকেটে এক্সপায়ারি ডেট থাকে, তেমনই – “বিশ্বাসের গ্যারান্টি: ৫ বছর”

২. যদি কেউ দল বদলাতে চান, সেটা লাইভে সম্প্রচার করতে হবে । সেখানে ভোটাররা সরাসরি প্রশ্ন করবেন—“গতকাল যাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলছিলেন, আজ তিনি হঠাৎ সাধু হয়ে গেলেন কীভাবে?”

তারপর জনগণ লাইভ ভোট দেবেন— “সমর্থন করছি” বা “সমর্থন করছি না”। ফলাফলের ভিত্তিতেই দলবদল বৈধ হবে!

৩. নেতা দল বদলালেই, জনগণ যেন সঙ্গে সঙ্গে ভোট দিয়ে তাকে সরাতে পারে। কারণ—

নেতা দলের জন্য নয়, জনগণের জন্য।

আর জনগণই আসল “হাই কমান্ড”!

৪. যদি কোনো নেতা দল বদলান— তার সম্পত্তির উপর বিশেষ কর বসানো হোক এবং সেই টাকা সরাসরি জনগণের উন্নয়নে খরচ হোক।

কারণ—“লোভের মূল্য” একটু চড়া হওয়া দরকার!

৫. যে দলের টিকিটে জিতেছেন, সেই দলের চেয়ারেই বসতে হবে।দল বদলাতে চাইলে আগে পদত্যাগ করুন, তারপর নতুন করে ভোটে জিতুন

তাহলেই বোঝা যাবে—জনগণ আপনাকে চায়, না শুধু চেয়ারটাই আপনাকে চায়!

রাজনীতি যদি আদর্শের জায়গা হয়, তাহলে দলবদল হওয়া উচিত বিরল ঘটনা।কিন্তু যদি সেটা “ক্ষমতা আর অর্থের খেলা” হয়ে যায়, তাহলে—আমাদের চোখ খুলতেই হবে। কারণ—

ভোট দিয়েই আমরা নেতা বানাই।

আর সেই ভোটের সম্মান রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদেরই।

17 thoughts on ““দলবদল উৎসব” নাকি গণতন্ত্রের ট্রান্সফার মার্কেট? – সুপ্রিয় রায়

  1. Ratnabali Chatterjee

    এই দল বদলের খেলা নিয়ে খুব ভাল একটা প্রতিবেদন।এই দলবদলুদের কান্ড কারখানা যেন একটা বিশ্বাসঘাত।যাকে বিশ্বাস করলাম কোন দলের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ভেবে,সে কোন লোভের হাতছানিতে চলে গেল যে দলের প্রতি বিশ্বাস গড়ে ওঠেনি সেই দলে।আপনি এর থেকে রক্ষা পাবার যে নিদান দিয়েছেন বেশ লাগল সেগুলো।

    Like

  2. Priyabrata Panja

    দাদা,সংবিধানের শুদ্ধতা,মৌলিকত্ব রাজনৈতিক দলগুলি মানেন না।সংবিধানের মধ্যে আইনপ্রনেতাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সীমিত করা আছে,তা সত্ত্বেও আজ বহুদলীয় গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থায়, বিভিন্ন আইনসভার জন্য,কোন দলের সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যাবস্থা একটা নির্নায়ক ভূমিকা বহন করে।

    সংবিধানের এই জায়গাটা মূলত নীতি, আদর্শ ও ভারতীয় সনাতন মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উচিত ছিল বা সংশোধিত হওয়া উচিত।

    আমাদের সংবিধানের অনেক দুর্বলতা আছে,তা সাধারন জনগনের ভালোর কথা ভেবে সংশোধিত হওয়া উচিত।

    দাদা,তোমার দেওয়া নিদান গুলি সমর্থন যোগ্য।কিন্তু মূল্যবোধ,নীতি,আদর্শহীন রাজনৈতিক দলগুলি এবং এদের চালিকা শক্তিরা নিজেদের আখের গেছাতেই ব্যাস্ত।এঁরা কি এর পরিবর্তনের পক্ষে সায় দেবে।

    এটা বন্ধ হবে তখনই,যখন নিজের পকটের পয়সায় সমাজ ও দেশসেবার জন্য,যে বা দল নিজেদের গনতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় কাজ বা জনগনের সেবা করার জন্য নিজেদের নিয়োজিত করবে।

    গুনী মানুষের দল,আদর্শ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উপর নির্ভর করে দেশ শাসনের দায়িত্ব নেবে,তখনই সম্ভব।

    অনেক রাষ্ট্রেই এই ব্যাবস্থা দেখা যায়।এটা নেতার ব্যাক্তি মানুষের নীতি,আদর্শ ও মূল্যবোধের উপর নির্ধারিত হয়ে তৈরি হয়।তাই ব্যাক্তি আগে না দল আগে এটা ভাবার দরকার,বা ভাববার চেষ্টা করা উচিত।তাই ব্যাক্তি মানুষ ঠিক না হলে,সমষ্টি মানুষ ঠিক হতে পারে না।এটা ভাববার বিষয় এবং ভাবতেই হবে।দেশ আগে না দল আগে,দল আগে না গুনী নীতিনিষ্ঠ মানুষের সমাহার সমাজে আগে।

    Like

  3. Partha Pratim Dasgupta

    এবিষয়ে আগেও অনেক কথা অনেক শোরগোল অনেক সমালোচনা হয়েছে কিন্তু কখনোই এর বিরুদ্ধে কোনো সংঘটিত প্রতিবাদ এই অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করতে পারেনি।

    Like

Leave a comment