পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে – সুপ্রিয় রায়

ইউরোপের একেবারে শেষ প্রান্তে , যেখানে পৃথিবী যেন হঠাৎ করেই থেমে গেছে—সেই জায়গাটির নাম North Cape। কোনদিন কল্পনাও করিনি—একদিন Arctic Circle পেরিয়ে পৃথিবীর প্রায় শেষ প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াবো! যেখানে আমাদের আর North Pole-এর মাঝে থাকবে না কোনো স্থলভূমি—শুধু বিস্তীর্ণ নীল সমুদ্র। নরওয়ের উত্তরের সেই প্রান্তে পৌঁছে সত্যিই মনে হয়েছিল, যেন স্বপ্ন দেখছি ……………

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ফিনল্যান্ডের Rovaniemi থেকে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ছুটে ছিলাম North Cape-এর দিকে। পথজুড়ে দু’পাশে সারি সারি পাইন বন, মাঝেমধ্যে বিশাল লেক, আর চোখে পড়ছিল দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো বল্গা হরিণ। ৩২৬ কিলোমিটার দূরে Inari-র কাছে লেকের ধারে কাটিয়েছিলাম এক শান্ত রাত।

পরদিন রওনা হয়েছিলাম নরওয়ের  Russenes-এর দিকে—নর্থ কেপ থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার আগে । উদ্দেশ্য ওখানকার হোমস্টেতে থেকে রাতভর Aurora Borealis দেখবো আর পরেরদিন সোজা চলে যাবো নর্থ কেপ। নির্জন সেই হোমস্টেতে আলো নিভিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম। হঠাৎ আকাশ ভরে উঠেছিল সবুজ আলোর ঢেউয়ে—এক অপার্থিব দৃশ্য! ক্যামেরা আর মনের ফ্রেমে বন্দি করেছিলাম সেই অমলিন মুহূর্তকে ।

পরদিন সকালেই রওনা দিয়েছিলাম  নর্থ কেপের পথে। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র—মাঝে রোমাঞ্চকর চারটে টানেল , যার একটি সমুদ্রের নিচ দিয়ে। । যাওয়ার সময় রোমাঞ্চিত হচ্ছিলাম ।টানেলের ঢোকার মুখে দেখলাম লেখা আছে ২১২ মিটার গভীর আর  ৬৮৭০ মিটার লম্বা । প্রত্যেক কিলোমিটার অন্তর একটা করে টেলিফোন বুথ । নিরাপত্তার সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া আছে । টানেল থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠছিলাম । হঠাৎ মেঘ এসে চারিদিক ঢেকে দিল । খুব আস্তে আস্তে সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছিল । একটু একটু পরিস্কার হচ্ছিল  আবার মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছিল ।এমনি করেই ধীরে ধীরে উপরে উঠে পৌচ্ছে গেলাম আমাদের গন্তব্যে ।

নর্থ কেপ আসলে একটি বিশাল পাথুরে খাড়া পাহাড়, যার নিচে উত্তাল Arctic Ocean। প্রায় ৩০০ মিটার নিচে সমুদ্র, আর ওপরে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা। পাহাড়ের উপর অনেকটা সমতল জায়গা  ,ওয়াকার টেবিলের ছবির মতো । সামনের দিকটা কেউ যেন সমানভাবে কেটে দিয়েছে ।আর তার নিচের দিকে শুধু দিগন্তজোড়া সমুদ্র, আর মনে ছিল এক অদ্ভুত শিহরণ—আমরা পৃথিবীর একেবারে মাথার ওপর দাঁড়িয়ে।

সেখানে একটা বিখ্যাত গ্লোব স্মৃতিস্তম্ভ আছে, যা পৃথিবীর শেষ প্রান্তের প্রতীক। সেই গ্লোবের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মুহূর্তটা জীবনের এক বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে চিরকাল ।

সেখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম জাদুঘরে আর চারপাশের অপার সৌন্দর্যে। তারপর ফিরতি পথ—আবার আর্কটিক সার্কেল ধরে, নতুন স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে সুইডেন হয়ে ল্যাপল্যান্ড । তারপর ল্যাপল্যান্ডের রোভানিয়েমির বিমানবন্দর হয়ে হেলসিঙ্কি ।

এই ভ্রমণ ছিল শুধু একটি যাত্রা নয় — জীবনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

Leave a comment