সান্তা ক্লসের গ্রাম -ল্যাপল্যান্ড

 

পর্যটকদের কাছে ল্যাপল্যান্ডের আকর্ষণ অনেকদিনের । কারণ এখানে আছে সান্তা ক্লসের গ্রাম , প্রচুর রেইন ডিয়ার , অরোরা বোরিয়ালিস , আর্কটিক সার্কেল , মধ্যরাত্রে সূর্য দেখার সূখ , স্লেজ গাড়ি , ইগলু , এছাড়া আছে অপূর্ব প্রাকিতিক সৌন্দর্য আর আছে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহ ধংসলীলার ইতিহাস ।

আমরা যদি একটু ভালো করে পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে একদম উপর দিকে অর্থাৎ উত্তর মেরুর দিকে দেখব একটা গোল বৃত্ত আঁকা আছে । সেটাকেই বলে আর্কটিক সার্কেল । এই আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে যে সব জায়গাগুলো আছে সব জায়গারই আবহাওয়া ঠান্ডা । কিছু কিছু জায়গা আবার সবসময় বরফে ঢাকা থাকে । আটটি দেশের মধ্য দিয়ে এই আর্কটিক সার্কেল গেছে । দেশগুলো হোলো নরওয়ে ,সুইডেন , ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ড , রাশিয়া , ইউনাইটেড স্টেটস (আলাস্কা ),কানাডা , গ্রীনল্যান্ড ও  আইসল্যান্ড ।

ল্যাপল্যান্ড ফিনল্যান্ডের উত্তর দিকের একটি সীমান্ত প্রদেশ যার তিনদিকে আছে সুইডেন ,নরওয়ে আর রাশিয়া । আমরা তখন ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে । হেলসিঙ্কি থেকে ট্রেনে ল্যাপল্যান্ড এক রাত্রির যাত্রা । নভেম্বর মাসের শেষ দিক , ভালই ঠান্ডা । প্রচুর বরফ পাবো  এবং অরোরা বোরিয়ালিস দেখার সুযোগ আছে । ছেলের কাছে শুনেছি রাত্রের আকাশ জুড়ে দেখা যায় সবুজ আলোর ঝলকানি । সারা আকাশ জুড়ে অনেক্ষণ ধরে চলে সবুজ আলোর ঢেউ । ওর বেশ কটা ছবিতে অরোরা বোরিয়ালিস দেখার সুযোগ পেয়েছি । তাই নিজের চোখে দেখার সুযোগ ফেলতে পারলাম না ।  ল্যাপল্যান্ডের হাতছানি তীব্রভাবে অনুভব করতে লাগলাম ।

l1

অগ্যতা ২৭,১১,২০১৫  বিকাল  সাড়ে পাঁচটা ,  তিনজনে রওনা হলাম হেলসিঙ্কি থেকে ট্রেনে করে ল্যাপল্যান্ড  । দোতলা ট্রেন , করিডরের  পাশদিয়ে পর পর অনেকগুলো ছোট ছোট কামরা । একটা কামরায় দুটো করে বার্থ ,উপরে আর নীচে । সুন্দর করে বিছানা পাতা । বেসিন, জামাকাপড় টাঙ্গানোর হ্যাঙ্গার , ছোটর মধ্যে সবই আছে । প্রায় সকাল ৮টা নাগাদ ল্যাপল্যান্ড  পোঁছালাম । অবশ্য ওখানে অন্ধকার । আলো হয় সকাল ৯টার পর , থাকে ২ টা অবধি ।ওয়েটিং রুমে  পরিস্কার হয়ে পাশের একটা  রেস্তরাঁতে সকালের জলখাবার  খেতে গেলাম ।এখানকার ওয়েটিং রুম ঝকঝকে পরিস্কার । ও একটা কথা লিখতে ভুলে গেছিলাম। এখানে ট্রেনে কোন আলাদা আলাদা ক্লাস নেই । সবই এক ।

স্টেশন থেকে খুব সাবধানে  পা ফেলে চলতে হচ্ছে । কারন আগেরদিনের স্নো বরফ হয়ে গেছে । আমাদের সাথে অনেক বিদেশী পর্যটক ট্রেন থেকে নামলো ।  ঠান্ডাতো কি হয়েছে , জায়গাটা তো ল্যাপল্যান্ড  । ট্যাক্সি  নিয়ে পৌঁছালাম সান্তা ক্লসের গ্রামে ।  রাস্তার দুপাশ বরফে সাদা হয়ে আছে ।  মনে হলো বরফে ঢাকা এক বিদেশী আশ্রম । চারিপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটা বাড়ী   । কোনটা সান্তার পোস্ট অফিস , কোনটা  বা অফিস  । পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে সান্তার নামে চিঠি এখানে আসে । এছাড়া আছে অনেকগুলো রেস্তরাঁ । একটা ভাল হোটেল ও পেট্রল পাম্প দেখলাম ।    সবই সুন্দর করে সাজানো । আর্কটিক সার্কেলটা যেখান দিয়ে গেছে সেই জায়গাটা খুব সুন্দরভাবে বোঝান হয়েছে ।  চারিদিকে প্রচুর ক্রিসমাস ট্রি  জায়গাটার পরিবেশকে খুবই মনোরম করে তুলেছে । শুধু বড়দিনের সময় নয় , সব সময় এই জায়গা বড়দিনের সাজে সজ্জিত । কিছু দূরে একটা হাস্কি পার্ক (Husky park) দেখলাম । গিয়ে দেখি নেকড়ের মতো দেখতে কিছু কুকুর বরফের উপর দিয়ে স্লেজ গাড়ী টানছে।

l2

ছোটবেলার ভুগোল বইয়ের কথা মনে পরে যাচ্ছিল । বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে স্লেজ গাড়িতে চড়ছি । চারপাশে বেশ কটা ইগলু দেখতে পেলাম । অনেকটা বরফের টেন্ট ।

l3

এরপর আরো অনেকের মতো সান্তার সাথে দেখা করতে চললাম । এখানে সান্তা ক্লসের সাথে প্রতেকদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা অবধি দেখা করা যায় । বিশাল লম্বা লাইন । আমরাও দাঁড়ালাম । দোতলার উপর একটা আলো আধাঁরি ঘরে বসে আছেন ওনার সেই পরিচিত লাল সাদা টুপি আর লম্বা গ্রাউন পরে । সৌম্য দর্শন বয়স্ক মানুষ আমাদের সাথে হাত মেলালেন । হেঁসে আমাদের সমন্ধে জানতে চাইলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি, কেমন লাগছে , কদিন থাকব এই সব আরকি । নিজেদের ক্যামেরাতে ছবি তোলা মানা । ওরাই ছবি তুললো , ভিডিও করলো । যারা নিতে চায় তারা কিনতে পারে । আমরাও সবার মতো স্মৃতি হিসাবে সান্তার সাথে আমাদের ছবি ও ভিডিও কিনে নিলাম । সারা গ্রাম ঘুরতে বেশ সময় লাগে । এখানে ২টার সময় অন্ধকার হয়ে যায় । এরপর আমরা টাক্সি নিয়ে ল্যাপল্যান্ডের রাজধানী রোভানিয়েমিতে আসলাম যেখানে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করা ছিল ।  ছিমছাম শহর । একটা দুই কামরার আসবাবপত্র সহ ফ্ল্যাট অন লাইনে ব্যবস্থা করা হয়েছিল । অনেকটা হোম স্টের মতো । ইচ্ছা করলে রান্না করেও খাওয়া যাবে । দুদিনের জন্য আমাদের বুক করা ছিল । চাবি নিয়ে নিজেরাই রাস্তা চিনে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম । জিনিসপত্র রেখে একটু আরাম করে বেড়িয়ে পরলাম রোভানিয়েমির রাস্তায় । শুনেছি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই রোভানিয়েমিতে জার্মান সৈন্যরা বিশাল প্রস্তুতি নিয়ে জড়ো হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুদ্ধ করার জন্য । যার নাম বার্বারোজা অপারেসন । এই যুদ্ধ আজ ভয়াবহ ইতিহাস । প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির সাক্ষী এই ল্যাপল্যান্ড । দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগের কোনো বাড়িঘর খুঁজে পাওয়া মুশকিল । সারা রোভানিয়েমি আগুনের শিখায় পুড়ে ছারখার হয়ে গেছিল । যা কিছু এখন ল্যাপল্যান্ডে দেখছি সবই প্রায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরের সময়কার । কিছুদূর হাঁটতেই অবাক কান্ড এখানেও একটা ভারতীয় রেস্তরাঁ । নাম রঙ্গমহল । এক নেপালী মহিলা চালান । সুন্দর রান্না । ভালই পরিচয় হলো । উনি নেপাল থেকে এসে এখানে রেস্তরাঁ খুলেছেন যেখানে ভারতীয় খাবার পাওয়া যায় । যেহেতু আমরাও কিছুটা নেপালী বলতে পারি তাই ভাল খাতির পেলাম । ল্যাপল্যান্ড-এ যখন ভারতীয় খাবার পাওয়া যাচ্ছে তখন আমরা নিশ্চিত যে পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেই ভারতীয় খাবার পাওয়া যাবে । আমার ছেলে বলছিল আজকাল ভারতীয় খাবারের আকর্ষন বিদেশে নাকি দিন দিন বাড়ছে । খাওয়া সেরে আবার ফিরলাম আমাদের হোম স্টে-তে । হোম স্টে-টা খুব ভালো ছিল । এককথায় বলা যায় খুবই আরামদায়ক । কিছুক্ষন হালকা বিশ্রাম নিয়ে ঠান্ডার ভালই প্রস্তুতি নিয়ে আবার চললাম সান্তার গ্রামে , যদি রাত্রের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস দেখতে পাই । শুনেছি বছরে প্রায় ২০০ রাত্রি অরোরা বোরিয়ালিস এখানে দেখা যায় । বাইরে দেখলাম ১ ডিগ্রী , হালকা বৃষ্টি হচ্ছে । ছাতা মাথায় দিয়ে তিনজনে পৌঁছে গেলাম । লোকজন নেই বললেই চলে । অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন আকাশ পরিস্কার হলো না, তখন বাধ্য হয়েই ঘরে ফিরতে হলো ।  রাত্রের খাবার বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল তাই ঘরে বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছিলাম । হঠাৎ জানলা দিয়ে বাইরে নজর যেতেই দেখি বরফ পড়ছে । অসাধারণ । কিছুক্ষন হয়ে বন্ধ হয়ে গেল । আমরাও শুয়ে পড়লাম । ভোরে উঠে দেখি চারিদিক সাদা । সারা রাত ধরে প্রচুর বরফ পরেছে । কাছেই একটা বড় হ্রদ আছে , গিয়ে দেখি জলের অনেকটা অংশই সাদা হয়ে আছে । বুঝতে পারলাম হ্রদের জলের অনেকটাই বরফ হয়ে গেছে । পাশেই একটা বড় পার্ক । এত বরফ পরেছে যে হাঁটতে পা ডুবে যাচ্ছে । মনটা ভরে গেল । তাপমাত্রা -৪ ডিগ্রী । কাছেই আর্কটিক সার্কেলের উপর একটা মিউজিয়াম আছে , সেটাই দেখতে গেলাম । বেশ কটি শ্বেত ভাল্লুক ও বল্গা হরিন ওখানে দেখলাম ।

l4

অরোরা বোরিয়ালিসের উপর একটা ডকুমেন্টারিও দেখলাম । দুধের স্বাদ ঘোলে মিটলো । চরকির মতো এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম । প্রতিটি বাড়ীর মাথা সাদা হয়ে আছে । গাছের উপর বরফ । তাপমাত্রা পজিটিভ হলে নাকি বরফ গলা শুরু হবে । যাইহোক আমাদের রাত্রি ৯টায় ট্রেন । হালকা ডিনার সেরে চললাম ষ্টেশন । ট্রেন ছাড়লো ৯ টা ১৫ মিনিটে । তখন তাপমাত্রা দেখাচ্ছিল -১ ডিগ্রী । ল্যাপল্যান্ডকে বিদায় জানিয়ে চললাম আমরা হেলসিঙ্কি

WITH SANTA CLAUSE AT LAPLAND.JPG

 

Please visit my You tube channel : https://www.youtube.com/cha…/UCwI8JNW7FmslSEXnG6_GAgw/videos

Supriyo Roy | Blog

%e0%a6%a8%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5-%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%aa

View original post

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s