প্রত্যেক নাগরিকের সংবিধান জানা কেন জরুরি?
প্রতিটি মানুষ যেমন নিজের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে, তেমনই নিজের অধিকার, কর্তব্য এবং নাগরিক পরিচয় সম্পর্কেও সচেতন থাকা উচিত। কারণ একজন সচেতন নাগরিকই পারে একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।
আমরা যে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশে বসবাস করি, সেই প্রিয় দেশ ভারতবর্ষের প্রত্যেক নাগরিকেরই দেশের সংবিধান সম্পর্কে অন্তত প্রাথমিক জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে আমি মনে করি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিকের সংবিধান জানার প্রয়োজন কী? সংবিধান তো দেশ পরিচালনার জন্য তৈরি, তাহলে একজন সাধারণ মানুষের জীবনে এর গুরুত্ব কতটা?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ।
সংবিধান শুধু দেশ পরিচালনার নিয়মকানুনের একটি পুস্তক নয়। এটি আমাদের অধিকার, স্বাধীনতা, সমতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। আমরা কী করতে পারি, রাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে কী আচরণ করতে বাধ্য, সরকার ও প্রশাসনের ক্ষমতার সীমা কোথায় এবং অন্যায়ের শিকার হলে কোথায় প্রতিকার চাইতে পারি—এসবের মৌলিক ভিত্তি রয়েছে আমাদের সংবিধানে।
তাই সংবিধান জানা মানে শুধু কিছু অনুচ্ছেদ বা আইনের ধারা মুখস্থ করা নয়; সংবিধান জানা মানে নিজের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া, অন্যের অধিকারকে সম্মান করতে শেখা এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা।
তাহলে সহজভাবে বলা যায়, ভারতবর্ষের প্রত্যেক নাগরিকের সংবিধান জানা কেন উচিত?এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—
১. নিজের অধিকার বোঝার জন্য – আমাদের কী কী অধিকার আছে, সেটার যদি পরিষ্কার ধারনা না থাকে এবং কেউ যদি আমাদের অধিকার লঙ্ঘন করে , তাহলে সেটা আমরা ধরতে পারবো না।
২. অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য – পুলিশ, সরকারি কর্মচারী, প্রশাসন বা অন্য কেউ অন্যায় করলে আইনসম্মতভাবে কীভাবে প্রতিবাদ করবো , তা জানতে পারবো।
৩. স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য – আমাদের মত প্রকাশ, ধর্ম পালন, চলাফেরা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারবো ।
৪. সরকারকে প্রশ্ন করার জন্য – সরকার জনগণের জন্য কাজ করে। তাই সরকারি কাজ, সরকারি খরচ, প্রকল্প ও পরিষেবা সম্পর্কে প্রশ্ন করার অধিকার আমাদের রয়েছে।
৫. নিজের পরিবার ও সন্তানদের সুরক্ষার জন্য – শিশুর শিক্ষা, নারীর অধিকার, সম্পত্তি, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা সম্পর্কে জানতে পারবো।
৬. ভোটের সঠিক ব্যবহার করার জন্য – কোন সরকার কীভাবে চলে, জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব কী এবং ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ — তা বুঝতে পারবো।
৭. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য – ভারতে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ বসবাস করেন। সংবিধান সকলের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার ভিত্তি তৈরি করে – সেটা জানতে পারবো ।
৮. কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসার জন্য – সংবিধান বৈজ্ঞানিক মনোভাব, মানবতাবোধ ও অনুসন্ধিৎসাকে উৎসাহিত করে সেটাও জানতে পারবো ।
৯. দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য – সরকারি কাজের স্বচ্ছতা, RTI এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারবো ।
১০. একজন দায়িত্বশীল মানুষ হওয়ার জন্য – শুধু নিজের অধিকার নয়, অন্যের অধিকার, দেশের ঐক্য, পরিবেশ ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতিও দায়িত্বশীল হতে পারবো ।
তাই ছোটবেলা থেকে ছাত্র , ছাত্রীদের সচেতন করার জন্য আমাদের দেশের প্রত্যেক স্কুলে (নিদেন পক্ষে অষ্টম শ্রেণী থেকে ) সংবিধান সম্পর্কে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করা উচিত বলে আমি মনে করি । তাহলে ছাত্র , ছাত্রীরা ছোটবেলা থেকেই শিখতে পারবে –
“সংবিধান শুধু রাষ্ট্রের নয়, সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের। তাই সংবিধান জানা কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য নয়, একজন সচেতন ও মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হয়ে ওঠার জন্য।”
বর্তমানে ভারতের সংবিধান দেশের অন্যান্য স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আঞ্চলিক ভাষাতেও অনুবাদ করা হয়েছে।