জীবনটা বাঁচব কখন? – সুপ্রিয় রায়

আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো – অনেক সময় বড় কোনো বিপদ নয়—বরং অসংখ্য ছোট ছোট অপ্রয়োজনীয় ঝামেলা।

একটা সাধারণ কাজ করতে গেলেই কখনও ফর্ম, কখনও সার্টিফিকেট, কখনও লাইনে দাঁড়ানো, কখনও অফিসে গিয়ে “আজ হবে না, কাল আসুন”—এইসব নিয়ে দিনের একটা বড় অংশ কেটে যায়। একটা সাধারণ কাজ করতে যাওয়া মানেই যেন এক মহাভারত যুদ্ধ জয় করা!

বিদ্যুৎ, জল, রাস্তা, সরকারি পরিষেবা, ব্যাংকের কাজ, সম্পত্তির কাগজ, কর, অনুমতি—জীবনের প্রয়োজনীয় কাজগুলোর সঙ্গে অনেক সময় এমন এক জটিলতা জড়িয়ে থাকে যে, কাজের চেয়ে কাজটি করানোর ঝামেলাই বড় হয়ে ওঠে।

আজকাল তো বেঁচে থাকার চেয়ে একটার সঙ্গে আরেকটা ‘লিংক’ করতেই জীবন কাবার হয়ে যায়।

মোবাইল নম্বরের সঙ্গে আধার,
আধারের সঙ্গে PAN,
PAN-এর সঙ্গে ব্যাংক,
ব্যাংকের সঙ্গে আরও কত কী!

একটা কাজ করতে গিয়ে মনে হয়— “আমি কাজটা করতে এসেছি, নাকি আমার জীবনের পুরো database তৈরি করতে?”

তারপর আসে আরও মারাত্মক এক অস্তিত্বের সংকট —আমি আসলে কে?

নিজের দেশেই জন্মেছি, বড় হয়েছি, পড়াশোনা করেছি, কাজ করেছি, কর দিয়েছি, ভোট দিয়েছি—তারপরও কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে,নিজের অস্তিত্ব, পরিচয় বা নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।

যুগে যুগে দার্শনিকরা খুঁজেছেন— “আমি কে?” আর আমাদের দেশে আমলাতন্ত্র আমাদের শেখায়— “প্রমাণ করুন আপনি কে!”

জীবনের এতগুলো বছর দেশে কাটানোর পরেও যদি বারবার কাগজ দেখিয়ে প্রমাণ করতে হয়—“আমি আমি-ই”,
তাহলে ব্যাপারটা সাধারণ মানুষের কাছে বেশ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

অবশ্যই রাষ্ট্রের পরিচয় যাচাই ও নাগরিকত্বের নথি থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—সেই প্রক্রিয়াটি কি মানুষের জন্য সহজ, স্বচ্ছ এবং সম্মানজনক হতে পারে না?

একজন সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যদি সরকারি ব্যবস্থার কাছেই থাকে, তাহলে একই তথ্যের প্রমাণ বারবার নাগরিককেই কেন নিয়ে ঘুরতে হবে?

প্রযুক্তির যুগে তো রাষ্ট্রের কাজ হওয়া উচিত—“আপনার তথ্য আমাদের কাছে আছে, আমরা যাচাই করে নেব।”

না যে—“আপনি প্রমাণ করুন আপনি কে, তারপর আমরা দেখছি।”

আমাদের দেশে আরও একটি মজার ব্যাপার হলো—
একটা ছোট কাজ করতে গেলেই কখনও ফর্ম, কখনও ফটোকপি, কখনও OTP, কখনও verification, কখনও signature, কখনও আবার “এই কাগজটা চলবে না, অন্যটা লাগবে!”

শেষে কাজটা যখন হয়, তখন মনে হয়—“এইটুকুর জন্য এত আয়োজন!”

প্রকৃত মানুষের উন্নয়ন তখনই বলা যেতে পারে — যখন মানুষের জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ কমিয়ে দেওয়া যাবে ।

একজন সাধারণ মানুষ যেন—

  • কম ফর্ম পূরণ করেন,
  • কম অফিসে ছোটেন,
  • কম কাগজ বহন করেন,
  • একই তথ্য বারবার জমা না দেন,
  • নিজের পরিচয় বারবার প্রমাণ করতে গিয়ে হয়রান না হন,
  • আর নিজের মূল্যবান সময়টা পরিবার, কাজ ও নিজের জীবনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

অফিসে বা কাউন্টারে গিয়ে বুড়ো হওয়ার আগেই একটু শান্তিতে নিশ্বাস ফেলতে চাই!এই ‘লিংক-পুরাণ’ আর কাগজ নামক কাগজের কান্নায় আমরা সত্যিই ক্লান্ত ।

জীবনটা এমনিতেই ভীষণ ছোট। তার অর্ধেক যদি কাটে ফর্মে সই করতে করতে আর লাইনে দাঁড়িয়ে পা ব্যথা করতে করতে, তবে আসল জীবনটা বাঁচব কখন ?

Leave a Reply