নার্সিংহোমের আইসিইউ-র কাঁচের ওপারে ওনি শুয়ে আছেন। মুখে ভেন্টিলেটরের নল, শরীরজুড়ে অসংখ্য তার। মনিটরের নিয়মিত “বিপ… বিপ…” শব্দটুকুই যেন বলে দিচ্ছে, জীবন এখনও হাল ছাড়েনি।
প্রতিদিন সকালে ভদ্রলোক একই প্রশ্ন করেন।
“ডাক্তারবাবু… কেমন আছে ও?”
ডাক্তার একটু থেমে উত্তর দেন,
“আমরা চেষ্টা করছি। এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কতদিন ভেন্টিলেশনে রাখতে হবে, সেটাও বলা যাচ্ছে না।”
এই উত্তরটাই তিনি গত দশ দিন ধরে শুনছেন।
এরপর কাউন্টারে গিয়ে বিলের কাগজটা হাতে নেন। প্রতিদিন সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বড় হয়। যেন কাগজে লেখা অঙ্ক নয়, তাঁর সারাজীবনের পরিশ্রম ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে।
অবসরের টাকার প্রায় সবটাই শেষ। ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে গেছে। গয়না বিক্রি হয়েছে। এখন বাড়িটাই শেষ সম্বল।
চেয়ারে বসে তিনি ভাবেন—
বাড়িটাও যদি বিক্রি করে দিই, আর যদি ও ফিরেই না আসে?
আবার মনে হয়—
যদি আজই ভেন্টিলেশন খুলে নিতে বলি, আর যদি কালই ওর জ্ঞান ফিরে আসত?
এই “যদি” শব্দটাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।
রাতে হাসপাতালের করিডরে বসে তিনি নিজের সঙ্গেই কথা বলেন।
“সারাজীবন ওর হাত ধরে চলেছি। আজ কি আমি টাকার হিসেব করে ঠিক করব, ও কতক্ষণ বাঁচার সুযোগ পাবে?”
পরমুহূর্তেই আরেকটা প্রশ্ন বুকের ভেতর থেকে উঠে আসে—
“কিন্তু যদি সব শেষ হয়ে যায়? যদি ও ফিরে না আসে, আর আমাদের মাথা গোঁজারও ঠাঁই না থাকে?”
দুই দিকেই অন্ধকার।
একদিকে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর আশঙ্কা।
অন্যদিকে, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় সারাজীবনের সবকিছু হারানোর ভয়।
সেই রাতে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। শুধু আইসিইউ-র কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে স্ত্রীর নিস্তব্ধ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
জীবনে এই প্রথম তিনি অনুভব করেন— সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলো সেইগুলোই, যেখানে কোনো উত্তরই পুরোপুরি সঠিক নয়।