সন্ধ্যার পরের জীবন – সুপ্রিয় রায়

স্বামীর মৃত্যুর পর সাথীর বাড়িটা যেন হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল।

একসময় যে বাড়িতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানুষের শব্দ লেগেই থাকত, সেখানে এখন ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটাও স্পষ্ট শোনা যায়।

দুই ছেলে বিদেশে । মেয়ে বেঙ্গালুরুতে। তিনজনই মাকে ভীষণ ভালোবাসে। সকালবেলা ফোন করে, দুপুরে মেসেজ করে, রাতে ভিডিও কল করে।

“মা, ওষুধ খেয়েছ?”

“মা, আজ কী রান্না করেছ?”

“মা, একা একা থেকো না, মন খারাপ হলে আমাদের ফোন কোরো।”

সাথী হাসতেন।

“তোদের সঙ্গে কথা বললেই তো আমার মন ভালো হয়ে যায়।”

কিন্তু ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সেই হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে যেত।

সকালের সময়টা তবু চলে যেত। ঘর গোছানো, রান্না করা, গাছগুলোতে জল দেওয়া, বাজার করা—এসবের মধ্যে ব্যস্ত থাকা যেত।

সমস্যা শুরু হতো সন্ধ্যার পর।

ছ’টা বাজলেই মনে হতো, দিনটা বুঝি শেষ হয়ে গেল।

টিভি খুলতেন। পাঁচ মিনিট পরেই বন্ধ করে দিতেন।

বই হাতে নিতেন। কয়েক পাতা পড়ার পর মন বসত না।

বারান্দায় বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

একদিন সন্ধ্যায় মেয়েকে ফোন করে বললেন,- “তোরা সবাই আমাকে এত ফোন করিস, তবু জানিস, আমার সারাদিনে সবচেয়ে খারাপ সময় কোনটা?”

মেয়ে চিন্তিত হয়ে বলল,-“কোনটা মা?”

“সন্ধ্যার পর।”

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেয়ে বলল,-“তুমি কিছু একটা করো না মা। এমন কিছু, যেটা করতে তোমার ভালো লাগে।”

সাথী হেসে বললেন,-“আমার আর কী ভালো লাগবে রে? আমি তো আর ছোট নেই।”

মেয়ে বলল,-“ছোট না হলেই কি মানুষের নতুন করে কিছু করার অধিকার থাকে না?”

কথাটা সাথীর মনে গেঁথে গেল।

পরের দিন সকালে আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে তিনি একটা পুরনো খাতা পেলেন।খাতাটা তাঁর স্বামীর।শেষের কয়েকটা পাতায় স্বামীর হাতের লেখা।এক জায়গায় লেখা—

“সাথী খুব সুন্দর গল্প বলতে পারে। ও যদি কখনও লিখতে শুরু করে, ভালো করবে।”

সাথী অনেকক্ষণ খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি কখনও লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিলেন না। বাংলা বই পড়তে ভালো লাগত, কিন্তু নিজে লেখার কথা কখনও ভাবেননি।

তারপর মনে হলো—“লিখলে কী হবে?”

সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা কণ্ঠস্বর মনে বলল—“কিছুই হবে না। তবু লিখব।”

সেদিন বিকেলে তিনি একটা খাতা কিনলেন।

প্রথম পাতায় লিখলেন—“আজ থেকে আমি আমার নিজের সঙ্গে কথা বলব।”

তারপর অনেকক্ষণ কলম হাতে বসে রইলেন।কিছুই লিখতে পারলেন না।

পরের দিনও না।তার পরের দিনও না। কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না।

একদিন দুটো লাইন লিখলেন।পরের দিন চারটে।তারপর একটা ছোট্ট ঘটনা।

পাড়ার এক বৃদ্ধার কথা।

তারপর নিজের জীবনের কথা।

স্বামীর সঙ্গে প্রথম দেখা হওয়ার কথা।

ছেলেমেয়েদের ছোটবেলার কথা।

আর লিখতে লিখতে তিনি বুঝতে পারলেন—তিনি আসলে একা নন।

তাঁর ভেতরে কত গল্প জমে আছে!

কয়েক মাস পর সাথী পাড়ার কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে সন্ধ্যার একটা ছোট্ট আসর শুরু করলেন।

নাম দিলেন—“সন্ধ্যার আড্ডা।”

প্রথম দিন এলেন তিনজন।

একজন স্বামীহারা।

একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা।

আর একজন, যার ছেলে-মেয়ে বিদেশে থাকে।

তারা চা খেলেন, গল্প করলেন, হাসলেন।

পরের সপ্তাহে এলেন সাতজন।

তারপর দশজন।

কেউ কবিতা পড়েন।

কেউ রান্নার নতুন রেসিপি শেখান।

কেউ পুরনো দিনের গান করেন।

কেউ নিজের জীবনের গল্প বলেন।

আর সাথী?

তিনি তাঁদের গল্প লিখে রাখেন।

একদিন পাড়ার এক মহিলা তাঁকে বললেন,-“দিদি, আপনি এগুলো ছাপাবেন না?”

সাথী হেসে বললেন,-“আমার লেখা আবার কে পড়বে?”

মহিলা বললেন,-“আপনি জানেন না, আপনার মতো কত মহিলা এই শহরে একা বসে আছে।”

কথাটা সাথীকে থামিয়ে দিল।

একদিন তাঁর ছেলে ভিডিও কলে বলল,-“মা, তুমি আজকাল অনেক বদলে গেছ বলে মনে হচ্ছে।”

সাথী হাসলেন।

“হ্যাঁ।”

“কী করছ এত?”

“গল্প লিখছি।”

ছেলে অবাক।

“তুমি?”

“হ্যাঁ, আমি।”

“কী নিয়ে?”

সাথী একটু চুপ করে বললেন,-“আমাদের মতো মেয়েদের নিয়ে। যারা ভাবে জীবন শেষ হয়ে গেছে।”

ছেলে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

সাথী বললেন,-“তুই জানিস, তোর বাবা মারা যাওয়ার পর আমি ভাবতাম আমার জীবনও শেষ।”

“এখন?”

“এখন বুঝেছি, একজন মানুষ চলে গেলে একটা সম্পর্ক শেষ হয়। মানুষটার জীবন শেষ হয় না।”

এক বছর পর সাথীর লেখা কয়েকটি গল্প নিয়ে ছোট্ট একটি বই বের হলো।

বইটির নাম—“সন্ধ্যার পরেও সকাল আছে”

প্রথম পাতায় তিনি স্বামীর উদ্দেশে লিখলেন—“তুমি চলে গিয়ে আমাকে একা করে দিয়েছিলে।কিন্তু হয়তো বুঝতে পারোনি, সেই একাকীত্বই একদিন আমাকে নিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে।”

বই প্রকাশের দিন মাধবীর ছেলে-মেয়ে সবাই এসেছিল।

মঞ্চে উঠে সাথী বললেন,-“আমি খুব বড় লেখক নই। খুব বেশি পড়াশোনাও করিনি। কিন্তু একটা জিনিস শিখেছি—আমরা মেয়েরা অনেক সময় নিজের জীবনটা সমাজের হাতে দিয়ে দিই।”

হলঘর নিস্তব্ধ।

“বয়স কখনও স্বপ্ন দেখার পথে বাধা হতে পারে না । সন্তান কাছে নেই—এটাও জীবনের শেষ কথা হতে পারে না ।আর সমাজ কী বলবে—সেটা তো একেবারেই নয়।

কারণ একা থাকা আর একাকী হয়ে থাকা এক জিনিস নয়।

কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে কঠিন সন্ধ্যার পরেই মানুষ নিজের ভেতরের নতুন আলোটা খুঁজে পায়।“

তিনি একটু থামলেন।

“আমি কাউকে বলছি না যে সবাই লেখক হোন। কেউ গান করুন, কেউ ছবি আঁকুন, কেউ বাগান করুন, কেউ রান্না শেখান, কেউ বাচ্চাদের পড়ান, কেউ নতুন কিছু শিখুন। যে কাজটা করলে সন্ধ্যা নামার পরও আপনার মনে হবে—কাল সকালে উঠে আবার এটা করব, সেই কাজটাই খুঁজে নিন।”

সামনের সারিতে বসা এক বৃদ্ধা চোখ মুছছিলেন।

সাথী মৃদু হেসে বললেন,-“স্বামী নেই, সন্তান কাছে নেই—এগুলো সত্যি। একাকীত্বও সত্যি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের আর কোনও প্রয়োজন নেই, কোনও স্বপ্ন নেই, কোনও পরিচয় নেই।”

তারপর তিনি শেষ কথাটা বললেন—“জীবনের প্রথম অধ্যায় অন্য কেউ লিখে দিতে পারে।কিন্তু শেষ অধ্যায়টা নিজের হাতে লেখার অধিকার আমাদের সবার আছে।”

হলঘর হাততালিতে ভরে গেল।

সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সাথী বারান্দায় বসেছিলেন।

আগের মতোই সূর্য ডুবছিল।

আগের মতোই চারপাশ ধীরে ধীরে অন্ধকার হচ্ছিল।

কিন্তু আজ তাঁর সন্ধ্যাটা আর নিঃসঙ্গ লাগছিল না।

টেবিলের ওপর খাতাটা খোলা।

নতুন গল্পের প্রথম লাইন লেখা—

“আজ সন্ধ্যায় আমার খুব ভালো লাগছে। কারণ আমি জানি, কাল সকালে আমার করার মতো অনেক কিছু আছে।”

Leave a Reply