কলকাতার চোরাবাগানে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলির প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই। এই ক্ষতি অপূরণীয়। কোনও আর্থিক ক্ষতিপূরণই প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা মুছে দিতে পারে না। তাই শুধু দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষতিপূরণের মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই চেষ্টাই হওয়া উচিত আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও আনন্দের উৎসব। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তার কোনও আপস হতে পারে না।
আজকাল অনেক নামী পুজোয় এমনভাবে মণ্ডপ তৈরি করা হয়, যেখানে প্রতিমা দর্শনের জন্য দর্শনার্থীদের মণ্ডপের ভিতরে প্রবেশ করতেই হয়। ফলে অল্প জায়গায় বিপুল মানুষের সমাগম ঘটে। ভিতরে ভিড় বাড়তে থাকলে আতঙ্ক, ধাক্কাধাক্কি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে আসার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
যতটা সম্ভব, মণ্ডপ ও প্রতিমাকে এমনভাবে সাজানো হোক, যাতে বাইরের খোলা জায়গা থেকেই অনেক মানুষ প্রতিমা দর্শন করতে পারেন। প্রতিমা দর্শনের জন্য প্রত্যেককে মণ্ডপের ভিতরে ঢুকতেই হবে, এমন ব্যবস্থা না রেখে দূর থেকে দর্শনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ভিতরে প্রবেশের চাপ কমতে পারে এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণ করাও তুলনামূলক সহজ হতে পারে।
এর পাশাপাশি কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া আমার মনে হয় জরুরি—
১. ভিড়ের সীমা নির্ধারণ: মণ্ডপের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী একসঙ্গে কতজন মানুষ প্রবেশ করতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করা এবং প্রয়োজন হলে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা।
২. খোলা জায়গায় দর্শনের ব্যবস্থা: বড় স্ক্রিন, উপযুক্ত আলো এবং প্রতিমার দৃশ্যমানতা বাড়ানোর মাধ্যমে বাইরে থেকেই দর্শনের সুযোগ তৈরি করা।
অবশ্যই, শুধু বাইরে থেকে প্রতিমা দেখার ব্যবস্থা করলেই দুর্ঘটনার সমস্ত আশঙ্কা দূর হবে না। মণ্ডপের নকশা, মানুষের চলাচল, ধারণক্ষমতা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি পরিষেবা—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
আয়জকদের মনে রাখতে হবে, পুজোর সাফল্য শুধু কত মানুষের ভিড় হল, কত বড় মণ্ডপ তৈরি হল, কিংবা কত পুরস্কার পাওয়া গেল, তার উপর নির্ভর করে না। পুজোর প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ আনন্দ করে বাড়ি ফিরবেন নিরাপদে।
পুজো কমিটিগুলির কাছে তাই বিনীত আবেদন—প্রতিযোগিতা হোক শিল্পে, সৃজনশীলতায় ও মানুষের মন জয় করার ক্ষেত্রে; কিন্তু মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নে নয়। দর্শনার্থীদের সুবিধা এবং নিরাপত্তাকে মণ্ডপ পরিকল্পনার প্রথম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
একটি দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন শোক প্রকাশ করে আবার সব ভুলে গেলে চলবে না। প্রতিটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখাক, ভবিষ্যতের ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে সাহায্য করুক।
কারণ, ঠাকুর দেখতে এসে কোনও মানুষকে যেন আর কখনও প্রাণ হারাতে না হয়। উৎসব সবার জন্য, আনন্দ সবার জন্য—আর সবার আগে প্রয়োজন সবার নিরাপত্তা।