ছোটবেলায় যখন অন্য ছেলেরা মাঠে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলত, তখন অর্ণব বসে থাকত একটা পুরোনো হারমোনিয়ামের সামনে। কখনও তবলা, কখনও গিটার, কখনও বাঁশি—যে যন্ত্রই তার হাতে উঠত, যেন প্রাণ পেয়ে যেত। সুর ছিল তার ভাষা, তাল ছিল তার শ্বাস।
পাড়ার সবাই বলত, “এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে।”
বয়স বাড়ল। অর্ণব একে একে আয়ত্ত করল অনেক বাদ্যযন্ত্র তার মধ্যে সবচেয়ে ভাল বাজাত সে তবলা । শহরের নামী গায়কদের অনুষ্ঠানে তাকে ডাকা হতো। মঞ্চে শিল্পী যখন গান গাইতেন, তখন অর্ণবের আঙুলে জন্ম নিত সেই গানের প্রাণ। আলো পড়ত শিল্পীর ওপর, কিন্তু সেই আলোকে সুন্দর করে তুলত মঞ্চের এক কোণে বসে থাকা অর্ণবের তবলা ।
সে স্বপ্ন দেখত—একদিন শুধু সঙ্গীত নিয়েই বাঁচবে।
কিন্তু স্বপ্নেরও তো সংসার থাকে না।
বাবা বললেন, “গানবাজনা দিয়ে সংসার চলে না। একটা স্থায়ী চাকরি করো।”
মায়ের চোখে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা।
অর্ণব চুপ করে চাকরিতে যোগ দিল।
প্রথম প্রথম অফিসের কাজ শেষ করেও সে তবলার সামনে বসে পড়ত। গভীর রাতে তবলার চামড়ায় স্নেহভরে হাত রেখে ফিসফিস করে বলত, “তোদের আমি কোনোদিন ছেড়ে যাব না।”
কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর।
কিছুদিন পর বাড়ির চাপে বিয়েও হলো। স্ত্রী, সন্তান, সংসারের খরচ, স্কুলের ফি, ওষুধ, বাজার, EMI—জীবনের তাল বদলে গেল।
ঘরের এক কোণে রাখা যন্ত্রগুলো ধীরে ধীরে ধুলোয় ঢেকে যেতে লাগল।
একদিন ছোট ছেলে জিজ্ঞেস করল,
“বাবা, এই তবলাটা কার?”
অর্ণব একটু হেসে বলল,
“একজন পুরোনো বন্ধুর।”
সে বলেনি, সেই বন্ধু আসলে তার নিজেরই হারিয়ে যাওয়া জীবন।
রবিবার ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। একটু অবসর পেলেই সে তবলার সামনে এসে বসত, মনে হতো আজ হয়তো আবার হারিয়ে যাবে তাল-লয়ের সেই পুরোনো জগতে। কিন্তু ভাগ্য যেন বারবার অন্য গল্প লিখে রাখত। ঠিক তখনই বাজারে যাওয়ার তাড়া, কখনও অতিথির আগমন, কখনও বা সংসারের কোনো জরুরি দায়িত্ব এসে তার সেই মুহূর্তটুকু কেড়ে নিত। সে নীরবে তবলার ওপর হাত রেখে কয়েক মুহূর্ত বসে থাকত, তারপর ধীরে ধীরে কাপড়ে ঢেকে দেওয়ালের পাশে সরিয়ে রাখত। তবলাটা যেন নির্বাক অভিমানে তাকিয়ে থাকত, আর সে মনে মনে বলত, “অপেক্ষা করো… একদিন আবার শুধু তোমার কাছেই ফিরে আসব।”
প্রতিদিন সে সংসারের সব দায়িত্ব পালন করত। কারও কোনো অভিযোগ ছিল না তার বিরুদ্ধে।শুধু একটা অভিযোগ ছিল নিজের কাছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাঝেমধ্যে মনে হতো, “আমি কি সত্যিই বেঁচে আছি? নাকি শুধু দায়িত্ব পালন করছি?”
রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে সে চুপচাপ যন্ত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকত। মনে হতো, ওরা যেন অভিমান করে বলছে,”তুই তো বলেছিলি, কোনোদিন ছেড়ে যাবি না।”
অর্ণবের চোখ ভিজে উঠত।
কিন্তু চোখের জল দিয়ে সংসার চলে না।
বছরের পর বছর কেটে গেল।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল অর্ণব। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ।
বয়স তখনও খুব বেশি হয়নি।
কিছু মৃত্যু শরীরের হয়, আর কিছু মৃত্যু স্বপ্নের। অর্ণবের স্বপ্নটি বহু বছর আগেই মারা গিয়েছিল,সেদিন শুধু তার শরীরটা বিদায় নিল।
শেষকৃত্যের পর ঘর গোছাতে গিয়ে তার ছেলে ধুলো জমা যন্ত্রগুলো বের করল। তবলার ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ পাওয়া গেল।
সেখানে অর্ণব লিখেছিল—
“সংসারের কাছে আমি কোনো অভিযোগ রেখে যাচ্ছি না। শুধু একটা আক্ষেপ রয়ে গেল—যাদের হাতে সুর ও তাল জন্ম নেয়, তাদেরও কখনও কখনও নীরব হয়ে বাঁচতে হয়। যদি আবার জন্ম পাই, তবে সংসার করব, দায়িত্বও নেব… কিন্তু নিজের স্বপ্নকে আর কোনোদিন এত একা ফেলে রাখব না।”
ছেলেটি তবলাটা বুকে জড়িয়ে অঝোরে কেঁদে উঠল।
সেদিন বহুদিন পর সেই বাড়িতে আবার তবলার বোল বেজে উঠেছিল। সেই একটুকরো শব্দেই যেন জেগে উঠেছিল বহুদিনের ঘুমিয়ে থাকা স্মৃতি, ভালোবাসা আর অপূর্ণ স্বপ্ন।