বিকেলের নরম রোদ। রাস্তার মোড়ের ছোট্ট চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে আছে সার্থক আর সাথী । পাঁচ বছরের প্রেম। এবার একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সার্থক মোবাইলটা সাথীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,— এটা দেখো।
সাথী পড়ে শোনাল—“Addition of Worries, Subtraction of Pocket Money, Multiplication of Thoughts and Division of Friends.”
পড়েই হেসে ফেলল সে।
সার্থক চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল,— দ্যাখ, এটাই হল বিয়ের সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা!
পাশে বসা থাকা সাথী হেসে বলল,— তাহলে বলছো বিয়ে একটা অঙ্কের বই!
সার্থক গম্ভীর মুখে বলল,— অবশ্যই। এখন আমি সিঙ্গেল। মাসের শেষে বেতন থাকে । বিয়ে করলে তো প্রথমেই “Pocket Money” থেকে বিয়োগ শুরু হবে!
ঠিক তখনই পাশের টেবিলে বসে থাকা বিবাহিত বন্ধু সৌম্য বলে উঠল,— আরে, শুধু বিয়োগ নয়। তার সঙ্গে “Addition of Worries” ফ্রি!
সবাই হেসে উঠল।
সার্থক বলল,— তারপর?
সৌম্য বলল,— তারপর “Multiplication of Thoughts”। সকালে ভাবো বাজার, দুপুরে ভাবো EMI, বিকেলে ভাবো বাচ্চার স্কুল, রাতে ভাবো আগামী মাসের খরচ!
সাথী প্রশ্ন করল,— আর “Division of Friends”?
সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,— আগে শনিবার মানেই বন্ধুদের আড্ডা। এখন শনিবার মানেই শপিং মল। বন্ধুরা এখনও আছে, তবে তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরে দু-একবার!
সবাই আবার হেসে উঠল।
ঠিক তখনই পাশের টেবিলে বসে থাকা এক দম্পতি কথাগুলো শুনে এগিয়ে এলেন।
ভদ্রমহিলা হেসে বললেন,— তোমরা শুধু অঙ্কের এক পাশটাই দেখছ!
ভদ্রলোক বললেন,— এবার অন্য অঙ্কটাও শোনো।
তিনি কাগজে লিখলেন—
Addition of Happiness
Subtraction of Loneliness
Multiplication of Responsibilities
Division of Sorrows
সার্থক অবাক হয়ে বলল,— এ আবার কী?
সাথী কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল,— এটাও তো অঙ্ক!
ভদ্রলোক হেসে বললেন,— হ্যাঁ। বিয়ে মানে শুধু খরচ বাড়া নয়, সুখও বাড়তে পারে। একাকীত্ব কমে। দায়িত্ব বাড়ে ঠিকই, কিন্তু কষ্টগুলোও ভাগ হয়ে যায়। শুধু খরচ বাড়লে বিয়ে খারাপ নয়, আর শুধু স্বাধীনতা থাকলেই জীবন ভালো নয়।
ভদ্রমহিলা যোগ করলেন,— তবে একটা কথা ঠিক, বিয়ের আগে ছেলেরা ভাবে, “আমি যা চাই তাই করব।” বিয়ের পরে ভাবে, “আজ যা বলবে তাই করব!”… এই জায়গাতেই আসল গণিত!
আবার এক দফা হাসির রোল উঠল।
সার্থক চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে বলল,— বুঝেছি। বিয়ে আসলে অঙ্ক নয়, প্রশ্নপত্র। প্রত্যেকের উত্তর আলাদা!
সৌম্য মুচকি হেসে বলল,— আর যে নকল করতে চায় , সে-ই সবচেয়ে কম নম্বর পায় !
চায়ের দোকানের সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখনই চায়ের দোকানে ঢুকল অফিসপাগল অর্ক ।
বসে বলল,— আমি বিয়ে করছি না।
সার্থক বলল,— কেন? পাত্রীর অভাব?
— না না! সময়ের অভাব এছাড়া আমি চাই না কেউ আমার সময়, সিদ্ধান্ত, বা জীবনধারা নিয়ন্ত্রণ করুক।
— মানে?
— এখন অফিস, জিম, অনলাইন কোর্স, নতুন স্কিল, উইকএন্ডে ট্রিপ—এসব নিয়েই ব্যস্ত। বিয়ে করলে তো সব শেষ! পরিবারকে সময় দেব, নাকি নিজের উন্নতি করব?
সৌম্য হেসে বলল,— তা হলে একটা প্রশ্ন করি। মোবাইল চার্জ দাও?
— অবশ্যই।
— গাড়িতে সার্ভিসিং করাও?
— অবশ্যই।
— নিজের শরীর খারাপ হলে ডাক্তার দেখাও?
— অবশ্যই।
— তাহলে সম্পর্কের জন্য একটু সময় দিতে হবে শুনলেই এত আপত্তি কেন?
অর্ক একটু চুপ।
সৌম্য আবার বলল,— সবাই ভাবে, বিয়ে মানেই ক্যারিয়ারের “স্পিড ব্রেকার”। কিন্তু ভালো সঙ্গী হলে সে অনেক সময় “জিপিএস” হয়ে যায়—রাস্তা ভুল করলে ঠিক পথও দেখায়!
পাশ থেকে ভদ্রমহিলা হেসে বললেন,— আর খারাপ সঙ্গী হলে?
ভদ্রলোক বললেন,— তখন সেটা “নেটওয়ার্ক নেই” লেখা মোবাইলের মতো! যতই চেষ্টা করো, কানেকশনই পাওয়া যায় না!
সবাই হেসে উঠল।
সার্থক বলল,— তাহলে বিয়ে করব কি করব না?
দোকানদার চা নাড়তে নাড়তে বলল,— অনেকেই বিয়েকে ভয় পায়, কিন্তু আসলে ভুল মানুষকে বেশি ভয় পাওয়া উচিত!
অর্ক বলল,— তাহলে তো সমীকরণটা বদলে গেল!
ভদ্রলোক আবার কাগজে লিখলেন—
ভুল সঙ্গী + তাড়াহুড়ো = মাথাব্যথা।
ঠিক সঙ্গী + পারস্পরিক সম্মান + সময় = জীবন অনেক সহজ।
সার্থক কাগজটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর সাথীর দিকে তাকিয়ে বলল,— জানো, আমি বিয়েকে ভয় পাচ্ছিলাম। আসলে বিয়েকে নয়, দায়িত্বকে ভয় পাচ্ছিলাম।
সাথী মৃদু হেসে বলল,— আমিও তাই। কিন্তু যদি আমরা একে অপরের পাশে থাকি, তাহলে দায়িত্বও তো ভাগ হয়ে যাবে ।
সার্থক হাত বাড়িয়ে দিল।
— তাহলে?
সাথী তার হাতটা ধরে বলল,—আমরা যদি আজীবনের প্রতিশ্রুতিই দিতে চাই, তাহলে বিয়েই হোক আমাদের নতুন পথচলার শুরু।
ঠিক তখনই চা-ওয়ালা বিল এগিয়ে দিয়ে বললেন,— এতক্ষণ বিয়ের অঙ্ক কষলেন, এবার চায়ের অঙ্কটা মিটিয়ে দিন!
সবাই হেসে উঠল।
সেই ভদ্রলোক মুচকি হেসে আবার বলতে শুরু করলেন ,— বিয়ে কখনও উন্নতির শত্রু নয়, আলস্য আর ভুল সিদ্ধান্তই উন্নতির সবচেয়ে বড় শত্রু।”
সার্থক বলল,— তা হলে বুঝলাম, বিয়ে আসলে চাকরির ইন্টারভিউয়ের মতো।
সাথী অবাক হয়ে বলল,— কীভাবে?
— ইন্টারভিউ না দিয়ে যেমন ভালো চাকরি পাওয়া যায় না, তেমনি মানুষকে না বুঝে শুধু ভয় পেয়ে বসে থাকলে ভালো সম্পর্কও পাওয়া যায় না!
চায়ের দোকানে আবার হাসির রোল উঠল।
চায়ের কাপ দুটো খালি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিন সার্থক আর সাথীর মনের দ্বিধাটাও যেন ধীরে ধীরে খালি হয়ে গিয়েছিল। তারা বুঝেছিল, সম্পর্কের সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটা বিয়ে নয়—সঠিক মানুষকে বেছে নিয়ে সারাজীবন তার পাশে থাকার সাহস।