বিকেলের শেষ আলো। রাস্তার পাশে পুরোনো চায়ের দোকানটা আজও ভিড়ে জমজমাট। কেটলির ধোঁয়া আর লেবু-চায়ের গন্ধে চারপাশ ভরে আছে।
এক কোণের বেঞ্চে পাশাপাশি বসেছে সার্থক আর সাথী । পাঁচ বছরের প্রেম। এবার তারা একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে এসেছে।
চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে সার্থক বলল,— একটা কথা ভাবছি। বিয়ের এত ঝামেলা ? অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজন, হাজার রকম নিয়ম। তার চেয়ে আমরা লিভ-ইন করলেই তো হয়। কেননা লিভ-ইন, কমিটেড রিলেশনশিপ, বা সেল্ফ-পার্টনারড হওয়াও এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
সাথী চায়ে চুমুক দিয়ে হেসে বলল,— আমারও তাই মনে হয়। স্বাধীনভাবে থাকব, ভালো লাগলে থাকব, না লাগলে আলাদা হয়ে যাব। বিয়ে মানেই তো দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা, যা স্বাধীনতাকে বাধা দেয় বলে মনে হয়।
পাশেই চা বানাতে বানাতে দোকানদার কথাটা শুনে হেসে ফেললেন।
— বাবা, তোমাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, সম্পর্কটা যেন মোবাইলের রিচার্জ প্ল্যান!
দুজনেই হেসে উঠল।
সার্থক বলল,— কাকু, আপনি বলুন না। আপনি কী করতেন?
দোকানদার চায়ের কেটলি নামিয়ে বললেন,— আমি? আমি তো বিয়ে করেছি। তবে একটা কথা বলি, বিয়ে মানুষকে বেঁধে রাখে না, মানুষ মানুষকে বেঁধে রাখে।
সাথী বলল,— কিন্তু লিভ-ইনে তো ভালোবাসা কম থাকে না।
— একদম ঠিক। ভালোবাসা কাগজে লেখা থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন কঠিন সময় আসবে, তখন তোমরা কী ভাববে? “চলে যাই”, না “একসঙ্গে সমাধান করি”?
কথাটা শুনে দুজনেই একটু চুপ করে গেল।
ঠিক তখনই পাশের টেবিলে বসা এক বৃদ্ধ হেসে বললেন,— তোমাদের একটা গল্প বলি?
সবাই তাঁর দিকে তাকাল।
— আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে পঁয়তাল্লিশ বছর। এই পঁয়তাল্লিশ বছরে কত ঝগড়া হয়েছে জানো? গুনে শেষ করতে পারব না। কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছে, রাগটা মানুষের ওপর নয়, পরিস্থিতির ওপর। তাই কেউ কাউকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবিনি।
সার্থক মৃদু হেসে বলল,— তা হলে প্রেমের আসল পরীক্ষা বিয়ের পরে?
বৃদ্ধ বললেন,— প্রেমের পরীক্ষা প্রতিদিন। অসুস্থ হলে পাশে বসা, চাকরি হারালে সাহস দেওয়া, ভুল করলে ক্ষমা করা—এসবই তো প্রেম।
সাথী ধীরে ধীরে চায়ের শেষ চুমুকটা খেল।
তারপর সার্থকের দিকে তাকিয়ে বলল,— জানো, আমরা এতক্ষণ শুধু স্বাধীনতার কথা বলছিলাম। কিন্তু সম্পর্ক তো শুধু স্বাধীনতা নয়, দায়িত্বও।
সার্থক মাথা নাড়ল।
— হ্যাঁ। আমি বুঝতে পারছি, আমি এমন একজন মানুষ চাই, যে শুধু সুখের দিনে নয়, কঠিন দিনেও বলবে—”আমি আছি।”
সাথী হেসে হাত বাড়িয়ে দিল।
— তা হলে?
সার্থক তার হাতটা আলতো করে ধরল।
— তা হলে বিয়ে করি। তবে একটা শর্ত।
— কী শর্ত?
— বিয়ের পরেও যেন আমরা প্রেমিক-প্রেমিকাই থাকি।
সাথী হেসে বলল,— এই শর্ত আমি সারাজীবনের জন্য মেনে নিলাম।
ঠিক তখনই এতক্ষণ চুপ করে থাকা বৃদ্ধ আবার ধীরে ধীরে বললেন— আর একটা কথা বলি বাবা। সম্পর্ক শুধু দু’জন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একদিন যদি তোমাদের জীবনে নতুন একজন আসে—তোমাদের সন্তান—তখন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, স্থিরতা আর পরিচয়ের অনুভূতি। সে যেন জানে, তার বাবা-মা শুধু একে অপরকে ভালোবাসেন না, তার প্রতিও সমান দায়িত্বশীল।
সার্থক আর সাথী মন দিয়ে শুনছিল।
বৃদ্ধ বললেন,— ভালোবাসা লিভ-ইনেও থাকতে পারে, বিয়েতেও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে এখনও বিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক স্বীকৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিশেষ করে সন্তান বড় হওয়ার পথে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সামাজিক পরিচয় অনেক সময় তাকে বাড়তি নিরাপত্তা ও স্থিতি দেয়। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবেও অনেকেই বিয়েকেই বেশি উপযুক্ত পথ বলে মনে করেন।
সাথী ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
— ঠিকই বলেছেন। আজ আমরা শুধু নিজেদের কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আগামী দিনে যদি আমাদের পরিবার বড় হয়, তাহলে শুধু ভালোবাসা নয়, দায়িত্ব, স্থিরতা আর একসঙ্গে পথ চলার প্রতিশ্রুতিও সমান জরুরি।
চা-ওয়ালা হেসে বললেন,— সংসার মানে শুধু দু’জনের গল্প নয়, আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তোলা। ভালোবাসা তার ভিত্তি, আর দায়িত্ব তার সবচেয়ে শক্ত খুঁটি।
সার্থক সাথীর হাত শক্ত করে ধরে বলল,— চল, শুধু আজ নয়, ভবিষ্যতের প্রতিটি দিনের দায়িত্বও আমরা একসঙ্গে নেব।
সাথী মৃদু হেসে উত্তর দিল— তাই তো… আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি হোক বিয়ে, আর সেই ভালোবাসাই একদিন আমাদের আগামী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠুক।
চা-ওয়ালা বিল নিয়ে এসে বললেন,— বিলটা কে দেবেন?
সার্থক হেসে বলল,— আজ আমি দিচ্ছি।
সাথী বলল,— না, অর্ধেক আমি দেব।
চা-ওয়ালা মুচকি হেসে বললেন,— এই তো সংসারের প্রথম পাঠ! হিসাব ভাগ করে নেওয়া সহজ, কিন্তু জীবন ভাগ করে নেওয়াই আসল। বিয়ে মানে শুধু একসঙ্গে থাকা নয়, একে অপরের দায়িত্বও নিজের বলে মেনে নেওয়া।
সার্থক সাথীর দিকে তাকিয়ে বলল,— চল, এবার শুধু চায়ের বিল নয়, জীবনের বিলটাও দু’জনে মিলে দেব।
সাথী হেসে উত্তর দিল,— আর সেই কারণেই… লিভ-ইন নয়, বিয়েই হোক আমাদের নতুন গল্পের শুরু।
Rinki Sen
Khub bhalo hoeche lekha ta — tomader purono chobi duto dekhe aaro bhalo laglo
LikeLike
Mitali Samadder
দারুন গল্প তার সাথে দুজনের পুরোনো ছবি খুব সুন্দর।
LikeLike
Tanima Goswami
Bha khub sundor likhecho.Darun laglo.
LikeLike
Mohan Lal Ghose
Very beautifully explained in favour of marriage
LikeLike
Nilangshu Roy
খুব ভালো লাগলো দাদা। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধি কিন্তু “বিয়ে” র পক্ষেই যাবে, কারণ “লিভ-ইন” অনেক সময়েই শারীরিক সম্পর্কে র মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যার সামান্য বিচ্যুতি অনেক ক্ষেত্রেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি ডেকে আনে। সেই দিক থেকে “বিয়ে” কিছুটা হলেও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে আসে এবং দুটি মানুষ তা অতি ধীরে হলেও মনে বা শরীরে সইয়ে নেয়। যদিও আজ সমাজের প্রেক্ষাপটে এই দুটি বক্তব্য ই আপেক্ষিক।…ভালো থাকবেন আপনারা


LikeLike
Aparna Delahiri
ভালো লাগলো গল্পটা


LikeLike
Biman Kumar Chatterjee
অপূর্ব। সুন্দর। পেশাদার লেখক দের মতো।
LikeLike
Aparajita Sengupta
খুব মন দিয়ে লেখাটা পড়লাম, আমি বিয়ের পক্ষেই রায় দিলাম। আমার কাছে বিয়ে শুধু দুটো মানুষের নয় ,এক পরিবারের সঙ্গে আর এক পরিবারের। অনেকগুলো মানুষকে আপন করে নেওয়া ।ভালোবাসা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া । খুব ভাল লাগল তোমার লেখাটা ।ছবিগুলো চমৎকার লাগল। স্মৃতি সততই মধুর।
LikeLike
Chandana Banerjee
একদম সহমত।দারুণ সুন্দর চেতনামূলক লেখা।ধন্যবাদ।
LikeLike
Anindita Majumdar
Lekhata porlam khub sundor..
LikeLike