“অন্ত” মানে শেষ, “ইষ্টি” মানে যজ্ঞ। তাই অন্ত্যেষ্টি মানে মানুষের জীবনের শেষ যজ্ঞ—যেখানে পঞ্চভূতে গড়া এই নশ্বর দেহকে আগুনের মাধ্যমে আবার প্রকৃতির কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই পর্যন্ত সবকিছুই যেন খুব সহজ, খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এর পরেই আমার মনে একের পর এক প্রশ্ন জাগতে থাকে।
এখনও প্রায়ই আমরা দেখি , বাড়িতে কেউ মারা গেলে অশৌচ পালন করতে হয়। নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত নানা নিয়ম মানতে হয়, তারপর শ্রাদ্ধ। তখন প্রশ্ন করার বয়স ছিল না। বড়রা যা বলতেন, তাই সত্যি মনে হতো।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে। আজ জন্ম হয় হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে, মৃত্যু হয় হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে জীবাণু কীভাবে ছড়ায়, সংক্রমণ কীভাবে রোধ করতে হয়। তাহলে সেই সময়কার সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থেকে তৈরি হওয়া বহু নিয়ম কি আজও একইভাবে প্রযোজ্য?
ইতিহাস বলে, একসময় অধিকাংশ জন্ম ও মৃত্যু ঘটত বাড়ির মধ্যেই। তখন জীবাণু সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত ছিল। তাই জন্ম ও মৃত্যুর পরে কিছুদিন পরিবারকে আলাদা থাকার নিয়ম হয়তো ছিল এক ধরনের সামাজিক স্বাস্থ্যবিধি। বাইরে থেকে কেউ যেন সংক্রমণ না আনে, ভেতরের সংক্রমণও যেন বাইরে না যায়। সেই বাস্তবতার মধ্যে অশৌচের একটি ব্যবহারিক অর্থ ছিল।
কিন্তু আজ?
কিছু প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণের জন্য ১০ দিন, ক্ষত্রিয়ের জন্য ১২ দিন, বৈশ্যের জন্য ১৫ দিন এবং শূদ্রের জন্য ৩০ দিন অশৌচ পালনের বিধান উল্লেখ আছে। এখানেই আমার প্রশ্ন।
একজন মানুষ মারা গেলে তাঁর সন্তানের চোখের জল কি জাত দেখে ঝরে?
একজন মায়ের বুকফাটা কান্না কি দশ দিনে শেষ হয়ে যায়, আর অন্য কারও ত্রিশ দিন লাগে?
মানুষের দেহের গঠন কি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র অনুযায়ী আলাদা?
যদি না হয়, তবে অশৌচ পালনের সময়ে এই বৈষম্যের ভিত্তি কোথায়?
একই ধর্মের মধ্যে মানুষে মানুষে এই ভেদরেখা কেন?
আমরা তো সবাই একই রক্ত, একই মাংস, একই আনন্দ, একই বেদনা নিয়ে জন্মাই।
শ্রাদ্ধ সম্পর্কেও নানা কথা শোনা যায়। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, মহামুনি নিমি তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পরে কিছু পূজনীয় ব্যক্তিকে আহার করিয়ে ও দান করে তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়েছিলেন। সেখান থেকেই নাকি শ্রাদ্ধের সূচনা। ইতিহাস যাই বলুক, এই কাহিনির মূল শিক্ষা ছিল হয়তো—দান, কৃতজ্ঞতা এবং স্মরণ।
কিন্তু আজ অনেক সময় সেই শ্রদ্ধার জায়গা দখল করে নিয়েছে সামাজিক বাধ্যবাধকতা, আড়ম্বর এবং লোকদেখানো অনুষ্ঠান।
আমার মন তখন আবার প্রশ্ন করে—
যে বাবা সারা জীবন সংসার চালাতে হিমশিম খেয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর পরে হাজার হাজার টাকা খরচ করে ভোজের আয়োজন করলে কি তাঁর আত্মা বেশি শান্তি পাবে?
যে মা সারাজীবন বলতেন, “অযথা টাকা নষ্ট কোরো না”, তাঁর মৃত্যুর পরে ঋণ করে ভোজন করানো কি তাঁর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা?
আমার উত্তর খুঁজে পাই না।
আমি বরং ভাবি, যদি সেই অর্থে একটি দরিদ্র ছাত্রের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা যায়, একটি গাছ লাগানো যায়, একটি হাসপাতালের রোগীর ওষুধ কেনা যায়, কিংবা একটি গ্রন্থাগারে বই দেওয়া যায়—তবে হয়তো মৃত মানুষটির স্মৃতি আরও অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকবে।
আমার মনে হয়, শোকেরও একটি নিজস্ব মর্যাদা আছে। শোক কোনও প্রদর্শন নয়। শোকের দিনগুলো আত্মীয়স্বজনকে খাওয়ানোর উৎসব হওয়া উচিত নয়। শোক মানে প্রিয় মানুষটির স্মৃতির সামনে নীরবে দাঁড়ানো, তাঁর ভালোবাসাকে মনে করা, তাঁর অসমাপ্ত আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করার সংকল্প নেওয়া।
আমরা প্রায়ই বলি—“শ্রদ্ধাই শ্রাদ্ধের প্রাণ।”
যদি সত্যিই তাই হয়, তবে শ্রদ্ধা কি কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি তা প্রকাশ পাবে আমাদের মানবিক কাজে?
আমি কোনও ধর্মকে অস্বীকার করতে চাই না। কোনও বিশ্বাসকে আঘাত করতেও চাই না। কারণ বিশ্বাস মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার।
আমি শুধু প্রশ্ন করতে চাই।
যে নিয়ম একসময় সমাজের প্রয়োজনে তৈরি হয়েছিল, সমাজ বদলে গেলে সেই নিয়মগুলোকেও কি নতুন করে ভাবা উচিত নয়?
যে ধর্ম মানুষের কল্যাণের জন্য, সেই ধর্ম কি মানুষের উপর অযথা বৈষম্য, আর্থিক চাপ বা সামাজিক বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিতে পারে?
হয়তো উত্তর সবার এক হবে না।
কিন্তু প্রশ্নগুলো করা জরুরি।
কারণ প্রশ্ন থেকেই জাগে চিন্তা, আর চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় সংস্কার নয়, সংস্কার-পরিবর্তন।
হয়তো একদিন এমন একটি সমাজ হবে, যেখানে অন্ত্যেষ্টি হবে শেষ যজ্ঞ, আর শ্রদ্ধা প্রকাশ পাবে মানুষের কল্যাণে। যেখানে মৃত্যুর পরে লোকদেখানো আয়োজনের বদলে থাকবে নীরব স্মরণ, ভালোবাসা এবং মানবসেবা।
সেদিন হয়তো আমরা সত্যিই বলতে পারব—
মৃত মানুষকে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর নামে ভোজ নয়, তাঁর আদর্শকে জীবনের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা।