মানুষের শরীরের গভীরে আছে এক আশ্চর্য রাজ্য—লাল রাজ্য। সেখানে কোটি কোটি লাল রক্তকণিকা ছোট্ট নৌকার মতো ছুটে বেড়ায়। তাদের কাজ শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া।
সেই রাজ্যেই একদিন জন্ম হলো একটি ছোট্ট লাল রক্তকণিকার। তার নাম লোহিত ।
লোহিত ছিল খুব কৌতূহলী। সারাদিনই সে প্রশ্ন করত।
একদিন সে তার দাদুকে জিজ্ঞেস করল,—”দাদু, আমার জামায় A লেখা কেন? আমার বন্ধুর জামায় আবার O লেখা!”
দাদু হেসে বললেন,—”ওটা কোনো লেখা নয়, ওটাই তোমার রক্তের গ্রুপ।”
—”রক্তের গ্রুপ আবার কী?”
দাদু তাকে নিয়ে গেলেন লাল রাজ্যের জ্ঞানী চিকিৎসকের কাছে।
চিকিৎসক বললেন,—”এসো, তোমাকে আমার চারজন বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।”
একটু পরেই চারজন এসে হাজির।
প্রথমজন বলল,—”আমি A।”
দ্বিতীয়জন বলল,—”আমি B।”
তৃতীয়জন হেসে বলল,—”আমি AB।”
চতুর্থজন হাত নেড়ে বলল,—”আর আমি O।”
চারজনের পোশাক আলাদা হলেও তাদের কাজ ছিল একই—জীবন বাঁচানো।
লোহিত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,—”তোমরা চারজন আলাদা হলে কেন?”
চিকিৎসক টেবিলের ওপর চারটি ছোট বাক্স রাখলেন।
তিনি বললেন,—”এই রহস্যের শুরু তোমার জন্মেরও আগে। যখন একটি নতুন শিশুর জীবন শুরু হয়, তখন বাবা আর মায়ের কাছ থেকে ছোট ছোট বার্তা আসে। সেই বার্তাগুলোর নাম জিন।”
তিনি দুটি রঙিন সুতো হাতে নিলেন।
—”এই জিনই ঠিক করে কার চোখ কেমন হবে, কার চুল কোঁকড়ানো হবে, কার উচ্চতা কেমন হতে পারে, এমনকি কার রক্তের গ্রুপ হবে A, B, AB না O।”
লোহিত বিস্ময়ে বলল,—”তাহলে আমার রক্তের গ্রুপ আমি নিজে ঠিক করিনি?”
—”না। কেউই নিজের রক্তের গ্রুপ বেছে নিতে পারে না। এটি বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জিনের উপহার।”
কয়েকদিন পরে খবর এল—একটি হাসপাতালে জরুরি রক্তের প্রয়োজন।তারা একটা রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছে ।
লোহিত আর চার বন্ধু সেখানে পৌঁছে গেল।
হাসপাতালের বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নেমেছে।
দূরে মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে।
অন্য পাশে মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে।
কোথাও গির্জার ঘণ্টা, কোথাও গুরুদ্বারের কীর্তন।
লোহিত চুপচাপ শুনছিল।
সে ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করল,—”এত রকম প্রার্থনা, এত রকম উপাসনা। তাহলে রক্ত কি বুঝতে পারে, কে কোন ধর্মের?”
ডাক্তারবাবু মৃদু হেসে বললেন,—”প্রার্থনার পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের শরীরের ভেতরে রক্তের ভাষা একটাই।”
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,—”সব ধর্মই মানুষকে দয়া, ভালোবাসা আর বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। হাসপাতালে যখন কেউ জীবন বাঁচাতে রক্ত দেয়, তখন সে প্রথমে একজন মানুষ—তারপর অন্য সব পরিচয়।”
লোহিত জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একই রক্তদান শিবিরে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে।
কারও হাতে জপমালা, কারও মাথায় টুপি, কারও গলায় ক্রুশ, কারও পাগড়ি।
কিন্তু রক্তের ব্যাগে কোথাও লেখা নেই—হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, শিখ বা বৌদ্ধ।
সেখানে শুধু লেখা আছে—A, B, AB, O… আর একটি শব্দ—”জীবন”।
লোহিত মনে মনে বলল,”মানুষের বিশ্বাসের পথ অনেক রকম হতে পারে। কিন্তু মানুষের রক্তের রং একটাই—লাল। আর জীবন বাঁচানোর আনন্দও সবার কাছে একই।”
লাল রাজ্যের বাতাসে তখন যেন একটাই কথা ভেসে বেড়াচ্ছিল—”‘জিন আমাদের রক্তের গ্রুপ ঠিক করে, কিন্তু মানবতা ঠিক করে আমরা সেই রক্ত দিয়ে কাকে জীবন উপহার দেব।’