একসঙ্গে বৃদ্ধ হওয়ার গল্প – সুপ্রিয় রায়

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল।

বারান্দায় বসে সার্থকবাবু  আর সাথীদেবী  চা খাচ্ছিলেন ।

দূরে পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমেছে। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ।

সার্থকবাবু হঠাৎ বললেন,— সাথী , আয়নাটা কি ছোট হয়ে গেছে?

সাথী দেবী অবাক।

— আয়না আবার ছোট হয় নাকি?

— তা হলে আমার চুলগুলো এত কম দেখাচ্ছে কেন?

— আয়না ছোট হয়নি, মাথার বাগানটা একটু ফাঁকা হয়েছে।

— খুব মজা পাচ্ছ, তাই না?

— তা একটু পাচ্ছি বৈ কি ।

সার্থকবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

— বয়সটা সত্যিই বেড়ে যাচ্ছে।

সাথীদেবী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

— হ্যাঁ, বেড়েই তো যাচ্ছে। কিন্তু খেয়াল করেছ, আমরা দু’জনেই একসঙ্গে বুড়ো বুড়ি হচ্ছি।

কথাটা শুনে সার্থকবাবু একটু মৃদু হাসলেন ।

সত্যিই তো।

একসময় যাঁরা ছিলেন নবদম্পতি, আজ তাঁরা সিনিয়র সিটিজেন।একসময় সিনেমা দেখতে গিয়ে শেষ বাস মিস করতেন।এখন ডাক্তার দেখাতে গেলে চশমা খুঁজতে খুঁজতে সময় চলে যায়।একসময় ছেলেদের স্কুলে পৌঁছে দিতে দৌড়তে হতো।

এখন ছেলেরাই বিদেশ থেকে ফোন করে বলে,— বাবা, মা তোমরা ওষুধ খেয়েছ তো?

জীবনটা কত বদলে গেছে!

পরদিন সকালে আবার যথারীতি ঝগড়া।

সার্থকবাবু তাঁর চশমা খুঁজে পাচ্ছেন না।

— সাথী , আমার চশমাটা কোথায়?

— আমি কী করে জানব?

— তুমি নিশ্চয় সরিয়েছ।

— আমি তোমার চশমার নিরাপত্তারক্ষী নই।

দশ মিনিট ধরে খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল চশমাটা সার্থকবাবুর মাথার উপরেই আছে।

সাথীদেবী বললেন,— অভিনন্দন। আজকের অনুসন্ধান অভিযান সফল হয়েছে।

— এটা বয়সের দোষ।

— না, এটা তোমার দোষ। বয়সকে সব সময় বলির পাঁঠা বানিও না।

দু’জনেই হেসে ফেললেন।

তবে বয়স বাড়ার কিছু বাস্তব সমস্যাও ছিল।

সাথীদেবীর হাঁটু মাঝে মাঝে ব্যথা করত।সার্থকবাবুর প্রেসার ওঠানামা করত।আগের মতো দ্রুত হাঁটা হতো না।দূরের ভ্রমণেও একটু বেশি পরিকল্পনা করতে হতো।

কিন্তু তারা একটা জিনিস কখনও বদলাতে দেননি—একসঙ্গে থাকার অভ্যাস।

একদিন সকালে হাঁটতে বেরিয়ে সাথীদেবী বললেন,— মনে আছে, বিয়ের পরে প্রথমবার সমুদ্র দেখতে গিয়েছিলাম?

— মনে আছে। তুমি ঢেউ দেখে এত ভয় পেয়েছিলে যে আমার হাত শক্ত করে ধরেছিলে।

— আর তুমি এত সাহসী ছিলে যে নিজেই পড়ে গিয়েছিলে।

— ইতিহাস বিকৃত করো না।

— আমি প্রত্যক্ষদর্শী।

আবার হাসি।আবার খুনসুটি।আবার সেই পুরোনো বন্ধুত্ব।

একদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গেল।ঘর অন্ধকার।দু’জনেই বারান্দায় এসে বসলেন।

হঠাৎ সাথীদেবী বললেন,— জানো, ছোটবেলায় ভাবতাম ভালোবাসা মানে শুধু সিনেমার গান, ফুল আর রোম্যান্স।

— আর এখন?

— এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে হলো কেউ তোমাকে বারবার জিজ্ঞেস করছে, “ওষুধ খেয়েছ তো?”

সার্থকবাবু হেসে বললেন,— আর ভালোবাসা মানে হলো কেউ তোমার চশমা খুঁজে দিচ্ছে, যদিও সেটা তোমার মাথাতেই থাকে।

দু’জনেই হেসে উঠলেন।

কিছুক্ষণ পরে সার্থকবাবু ধীরে ধীরে বললেন,— একটা কথা বলব?

— বলো।

— বৃদ্ধ হওয়াটা খুব একটা ভয়ঙ্কর নয়।

— না?

— না। যদি পাশে এমন একজন থাকে, যার সঙ্গে হাসা যায়, ঝগড়া করা যায়, স্মৃতি মনে করা যায়।

সাথীদেবী চুপচাপ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সার্থকবাবু আবার বললেন,— জানো, জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য কী?

— কী?

— একসঙ্গে বুড়ো হওয়ার সুযোগ পাওয়া।

সাথীদেবীর চোখে তখন হালকা জল চিকচিক করছে।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,— আর সেই সুযোগটা আমরা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছি।

দূরে আবার বৃষ্টি নামতে শুরু করল।দু’জনে পাশাপাশি বসে রইলেন।কোনো বড় কথা নয়।কোনো নাটকীয়তা নয়।শুধু একসঙ্গে থাকা।

হয়তো এটাই ভালোবাসার সবচেয়ে পরিণত রূপ।

যেখানে হাত ধরার উত্তেজনার চেয়ে হাতটা পাশে আছে—এই নিশ্চিন্তিটাই বেশি মূল্যবান।

যেখানে প্রতিদিন “আমি তোমাকে ভালোবাসি” বলার প্রয়োজন হয় না।

কারণ সেই কথাটা লুকিয়ে থাকে এক কাপ চায়ে, একটি ওষুধের বাক্সে, একটি ছাতার নিচে, কিংবা একসঙ্গে হাঁটার ধীর পায়ে।

আর সেই কারণেই সার্থকবাবু আর সাথীদেবীর গল্পটা শুধু স্বামী-স্ত্রীর গল্প নয়।

এটা দুই বন্ধুর গল্প।দুই সহযাত্রীর গল্প।

যারা জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বুঝেছেন—যৌবনে প্রেম করা সুন্দর,

কিন্তু একসঙ্গে বৃদ্ধ হওয়া তার থেকেও সুন্দর।

কারণ বয়স শরীরে পড়ে,

ভালোবাসার ওপর নয়।

Leave a comment