শ্রুতিনাটক : আধুনিকতা বনামঐতিহ্য  – সুপ্রিয় রায়

আধুনিকতা: এই যে ঐতিহ্য  …………

ঐতিহ্য : কিছু বলবে আধুনিকতা ………………

আধুনিকতা: হাঁ ঐতিহ্য , তোমার ইচ্ছা করে না প্রযুক্তি নির্ভর গ্যাজেট ব্যবহার করে জীবনটা আরও সহজ করতে ।

ঐতিহ্য : আরে বাবা,  নিজের হাতে কাজ করার মধ্যে একটা আন্তরিকতা থাকে ।সেটা বোঝো আধুনিকতা ।

আধুনিকতা: ওহ, তুমি কি এখনো উনুনে রান্না করো? আমি তো এখন রান্না মেসিনে বসিয়ে দিই আর রান্না নিজের থেকেই হতে থাকে ।

ঐতিহ্য : না , আমি এখন গ্যাসে রান্না করি , কিন্তু উনুনে বা গ্যাসে রান্নার গন্ধে যে নস্টালজিয়া আছে, সেটা তোমার মেসিনে আসবে না।

আধুনিকতা: নস্টালজিয়া দিয়ে কি পেট ভরে?

ঐতিহ্য : নস্টালজিয়া দিয়ে মন ভরে! আর মন ভালো থাকলে পেটও ভরে।

আধুনিকতা: শুনতে ভাল লাগলো , কিন্তু সেলফি তোলার জন্যও তো এখন ফোনের দরকার, তাই না ?

ঐতিহ্য : আরে বাবা আমাদের সময়ও সেলফি ছিল, কিন্তু তার নাম ছিল পারিবারিক ছবি। আর সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসতো।

আধুনিকতা: তাই নাকি? তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছবি পোস্ট না করলে তো ছবি তোলার মজাই নেই!

ঐতিহ্য : সোশ্যাল মিডিয়াতে থাকতো না ঠিকই তবে সেই ছবিগুলো হৃদয়ের অ্যালবামে থাকতো ।

আধুনিকতা: কিন্তু আজকের দিনে এতো ধীরগতিতে কি চলে?

ঐতিহ্য : ধীর গতি মানেই থেমে থাকা নয়। এর মানে সময় নিয়ে প্রকৃত জিনিসগুলো উপভোগ করা যদি ভেতরে শান্তি খুঁজতে চাও।

আধুনিকতা: কী বলো? আমি এখন স্মার্টওয়াচে সময় দেখি, স্মার্টফোনে ব্যাংকিং করি ।

ঐতিহ্য : মানলাম। কিন্তু প্রযুক্তি কি তোমাকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনতে পারে? সেই পাখির ডাক, নদীর কুলকুল শব্দ, আর মাটির গন্ধ?

আধুনিকতা: না । তবে প্রযুক্তি কিন্তু ভার্চুয়াল রিয়ালিটি এনে দিয়েছে, যেখানে নদী, পাহাড় সবকিছু এক ক্লিকে চোখের সামনে চলে আসে।

ঐতিহ্য : তোমার ঐ ভার্চুয়াল জগতে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতিটা কোথায়? মাটির গন্ধ কি স্ক্রিন থেকে আসে?

আধুনিকতা: আচ্ছা ,  চিঠি লেখার কথা ভাব । আগে কতদিন  লাগতো কোন মেসেজ দেওয়া নাওয়া করতে । আর এখন এক সেকেন্ডে ম্যাসেজ পৌঁছেও যায় আর সাথে সাথে রিপ্লাইও পাওয়া যায় ।

ঐতিহ্য : হ্যাঁ, মানছি এটা দারুণ! কিন্তু সেই চিঠির মধ্যে যে আবেগ, অপেক্ষার মিষ্টি যন্ত্রণা—সেটা কি মেসেজে মেলে?

আধুনিকতা: কিন্তু সময় তো এগিয়ে যাচ্ছে, পুরোনো অভ্যাস সবসময় ধরে রাখা সম্ভব না।

ঐতিহ্য : সময় এগোয়, ঠিক। তবে শিকড় ভুলে গেলে গাছ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। আমাদের মূল ঐতিহ্যটুকু মনে রাখা জরুরি।

আধুনিকতা: (একটু ভেবে) আচ্ছা, তোমার ঐতিহ্যের কোন ব্যাপারগুলো আমি গ্রহণ করতে পারি বলো তো?

ঐতিহ্য : সহজ! একদিন শহরের হট্টগোল ছেড়ে গ্রামে চলে এসো। মাটির ঘরে থেকো, খোলা আকাশের নিচে বসে একবেলা খাবার খাও।

আধুনিকতা: শুনতে বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে! তবে সেখানে ইন্টারনেট থাকবে তো?

ঐতিহ্য : (হেসে) থাকবে, তবে তাকে একটু বিশ্রাম দাও। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগই তখন আসল হবে।

আধুনিকতা: ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনে হয় প্রযুক্তি আর ঐতিহ্যের মিলন হলে পৃথিবীটা আরও সুন্দর হতে পারে।

ঐতিহ্য : একদম! আধুনিকতা দিয়ে জীবনকে সহজ করো, আর ঐতিহ্য দিয়ে জীবনকে সমৃদ্ধ।

আধুনিকতা: দারুণ! আচ্ছা, চলো আজ একটা প্ল্যান করি। তোমার ঐতিহ্য আর আমার প্রযুক্তির মিশ্রণে একটা নতুন কিছু করি!

ঐতিহ্য : রাজি আছি। কিন্তু শর্ত একটাই—তোমার নতুন পরিকল্পনাটা করতে হবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে।

আধুনিকতা: চা! সেটাতো তুমি মাটির ভাঁড়ে বানাবে, তাই তো?

ঐতিহ্য : একদম! আর সেই চায়ের গন্ধে আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হবে।

আধুনিকতা: আচ্ছা , তোমাদের ঐতিহ্যের সেরা দিকটা কী?

ঐতিহ্য : সেরা দিক? আমাদের আন্তরিকতা। খাঁটি সম্পর্ক, গানের আসর, আর হাতে গড়া জিনিসের মায়া।

আধুনিকতা: (হাসি দিয়ে) সম্পর্কের কথা বলছো! এখন তো সব সম্পর্ক অনলাইনে চলে। দু’দিন ম্যাসেজ না করলে বন্ধুত্বেই ফাটল ধরবে।

ঐতিহ্য : এই তো পার্থক্য! আমাদের সময় বন্ধুত্ব ছিল বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে। কেউ না ডাকলেও বন্ধুর দরজায় পৌঁছে যেতাম।

আধুনিকতা: তাহলে ঠিক আছে। তোমার ঐতিহ্যকে মনে রেখে আমি আমার প্রযুক্তিকে আরও অর্থবহ করে তুলব।

ঐতিহ্য : আর আমি তোমার প্রযুক্তির সাহায্যে আমার ঐতিহ্যকে সবার কাছে পৌঁছে দেব।

দুজনে – তাহলে চলো গাই বন্ধুত্বের গান

আলো-ছায়ার মিশ্রণে,
চল গাই জীবনের গান ।
নতুনের সাথে পুরনো মিলে ,
মেতে উঠুক দেহ মন প্রান ।

আধুনিকতা , ঐতিহ্যের গান,
একসাথে গাই, হাতে রাখি হাত।
পুরনো শেকড় ছুঁয়ে আকাশ,
নতুন দিনের স্বপ্নের রাত।

নতুনের সাথে পুরাতন রঙ,
একই সুরে গাঁথা হৃদয়ের ঢং।

আধুনিক চোখে ঐতিহ্যের ধ্বনি,
একই সাথে চিঠি ইন্টারনেটের বাণী।

Leave a comment