স্বামী-স্ত্রীর ডিভোর্সের মামলা আদালতে উঠেছে। বিচারকের ঘরে দুই পরিবারের সদস্যরা বসে আছে। স্বামী, স্ত্রী, তাঁদের আট বছরের ছেলে, ঠাকুরদা, ঠাকুমা—সবার মুখেই উদ্বেগের ছাপ।
অনেকক্ষণ ধরে দুই পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তি, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগ শোনার পর বিচারক রায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—ছেলেটি কার কাছে থাকবে?
ঠিক সেই সময় ছেলেটির ঠাকুরদা বিচারকের কাছে কিছু বলার অনুমতি চাইলেন।
অনুমতি পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
-“স্যার, ও জন্মানোর দিন থেকে আমি ওর পাশে আছি। ওর প্রথম হাঁটা, প্রথম কথা বলা, প্রথম স্কুলে যাওয়া—সব আমার চোখের সামনে। রাতে ও কোন কোন দিন আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। আজ ওর বাবা-মা একসঙ্গে থাকতে পারছে না, সেটা তাঁদের সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমার অপরাধটা কী?
আমি কি শুধু বয়সে প্রবীণ ঠাকুরদা বলে ভালোবাসার অধিকার হারিয়ে ফেলেছি?
ও যদি একদিন জিজ্ঞেস করে—’দাদু, তুমি কোথায় গেলে?’
তখন আমি কী উত্তর দেব? বলব, আদালতের একটা সিদ্ধান্ত আমাদের মাঝখানে দেয়াল তুলে দিয়েছে?”
ঠাকুরদার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
-“স্যার, একটা ডিভোর্স শুধু দুজন মানুষকে আলাদা করে না। একটা শিশুর শৈশবকে ভেঙে দেয়। একজন দাদুর অপেক্ষাকে নিঃস্ব করে দেয়। একজন ঠাকুমার গল্প বলা বন্ধ করে দেয়। একটা পরিবারের শত স্মৃতি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ডিভোর্স কখনও কখনও প্রয়োজন হতে পারে, আমি তা অস্বীকার করছি না। কাউকে দোষও দিচ্ছি না।শুধু বলছি, যদি সম্ভব হয়, শেষবারের মতো আরেকবার ভাবুন। কারণ, সম্পর্ক ভাঙা সহজ। কিন্তু ভাঙা সম্পর্কের কান্না সারাজীবন বয়ে বেড়ানো খুব কঠিন।”
ঠাকুরদা চুপ করে গেলেন।
আদালত নিস্তব্ধ। অনেকের চোখে জল। বিচারকও কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।
কারণ তিনি বুঝেছিলেন—আইন ডিভোর্স দিতে পারে,কিন্তু একটি শিশুর ভাঙা মন জোড়া লাগাতে পারে না।তারপর টেবিলের উপর রাখা ফাইলটির দিকে তাকালেন। সেই ফাইলের ভেতরে ছিল ডিভোর্সের আবেদন।
আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ছোট্ট শিশু, যার পৃথিবীটা সেই কাগজের কয়েকটি পাতার মধ্যেই ভেঙে যাওয়ার অপেক্ষায়।
ছেলেটি হঠাৎ দাদুর হাত ধরে বলল,— “দাদু, আমি যদি মায়ের কাছে থাকি, তুমি কি আমাকে দেখতে পাবে?”
দাদু উত্তর দিতে পারলেন না।
— “আর যদি বাবার কাছে থাকি, তাহলে মা কি আমাকে রাতে ঘুম পাড়াবে?”
মাও উত্তর দিতে পারলেন না।
— “তোমরা সবাই বলছো আমাকে খুব ভালোবাসো। তাহলে আমাকে নিয়ে সবাই আলাদা আলাদা হয়ে যেতে চাও কেন?”
আদালতে এমন নীরবতা নেমে এল, যেন কারও নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে।
ছেলেটি তার স্কুলব্যাগ খুলে একটি ছবি বের করল।একটি সাধারণ পারিবারিক ছবি।বাবা, মা, দাদু, ঠাকুমা আর সে।
ছবিটা বিচারকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,— “আঙ্কেল , এই ছবিটা ছিড়ে গেলে আবার জোড়া লাগানো যাবে?”
বিচারক বললেন,— “হয়তো যাবে।”
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল,— “কিন্তু দাগটা থেকে যাবে, তাই না?”
বিচারকের আর কোনো উত্তর ছিল না।
কারণ আট বছরের একটি শিশু সেদিন এমন একটি সত্য বলে দিয়েছিল, যা অনেক বড় মানুষও বুঝতে পারে না।
ছেলেটি আবার বলল,-“সবাই বলছে আমি কার সঙ্গে থাকব। কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করছে না আমি কাদের সঙ্গে থাকতে চাই। আমি মা’কে চাই। আমি বাবা’কে চাই। আমি দাদু-ঠাকুমাকেও চাই। আমি কাউকে হারাতে চাই না।”
তারপর সে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল।
কথাগুলো শুনে যেন সময় থমকে গেল।
বাবা ধীরে ধীরে ছেলের কাছে এগিয়ে এলেন।
মাও এগিয়ে এলেন।
দুজনেই হাঁটু গেড়ে বসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
অনেকদিন পর প্রথমবার।
ছেলেটি দুই হাতে বাবা-মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
সেদিন আদালতে কোনো রায় ঘোষণা হয়নি।
কিন্তু অনেকের হৃদয়ে একটি রায় লেখা হয়ে গিয়েছিল—
রাগের মুহূর্তে ডিভোর্সের আবেদন করা যায়, কিন্তু একটি শিশুর চোখের জল মুছে ফেলার আবেদন করার মতো কোনো আদালত পৃথিবীতে নেই।
কারণ সম্পর্ক শুধু দুইজন মানুষের নয়।
কখনও কখনও একটি শিশুর পুরো পৃথিবী সেই সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
আর সেই পৃথিবী ভেঙে গেলে,
তার শব্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায় না আদালতে—
শোনা যায় একটি ছোট্ট শিশুর নিঃশব্দ কান্নায়।।।।।।।।।।।।।।।।।।