সার্থক আর সাথীর বিয়ে হয়েছে তা প্রায় দশ বছর হতে চললো । এই দশ বছরে তারা একটি বিষয় খুব ভালোভাবে বুঝে গেছে — একই ঘটনাকে দু’জন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখতে পারে।
সাথী সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করে। কোনো সমস্যাই তাঁকে সহজে বিচলিত করতে পারে না। অন্যদিকে সার্থক জন্মগতভাবেই যেন একটু নেগেটিভ। ভালো কিছু ঘটলেও তার মধ্যে সম্ভাব্য বিপদের গন্ধ খুঁজে বের করাই তাঁর স্বভাব।
একদিন বাজার থেকে ফিরে সার্থক মুখ গোমড়া করে বসে আছে।
সাথী জিজ্ঞেস করলো — কী হলো?
— মাছ তো পেয়েছি, কিন্তু ভাবছি এত তাজা মাছ খেয়ে যদি হজম না হয়!
সাথী হেসে বললো — আগে খাও, তারপর না হয় হজমের চিন্তা করো। তুমি তো দেখছি জন্মদিনের কেক কাটার আগেই ডায়াবেটিসের ভয় পাও! আচ্ছা, ছোটবেলায় লজেন্স পেলেও কি ভাবতে, “দাঁত নষ্ট হবে”?
সার্থক উত্তর না দিয়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললো ।
কয়েকদিন পরে প্রবল বৃষ্টিতে আবাসনের বাগান সবুজে ভরে উঠল।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাথী বললো — কী সুন্দর! মনে হচ্ছে প্রকৃতি নতুন করে সেজেছে।
সার্থক একই দৃশ্য দেখে বললো — এই তো এখন মশা বাড়বে, বিদ্যুৎ যাবে, চারদিকে কাদা হবে!
সাথী হেসে বললো — তোমার সামনে রামধনু দেখালেও তুমি বলবে, “আবার বৃষ্টি শুরু হবে না তো?
একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
সাথী মোমবাতি জ্বালিয়ে বললো — বেশ রোম্যান্টিক পরিবেশ হয়েছে।
সার্থক বললো — রোম্যান্টিক নয়, মশার আক্রমণের প্রস্তুতি!
— আচ্ছা, তুমি কি কখনো কোনো কিছুর ভালো দিক দেখো না?
— দেখি তো।
— কী?
— বিদ্যুৎ গেলে অন্তত বিদ্যুতের বিল বাড়ে না!
সাথী হেসে ফেললো ।
তাঁদের বিবাহবার্ষিকীর দিন সাথী বললো — চল, আজ বাইরে খেতে যাই।
সার্থক সঙ্গে সঙ্গে বলল — বাইরে গেলে ভিড় হবে, খাবার ভালো নাও হতে পারে, গাড়ি পার্কিংয়ের সমস্যা হতে পারে…
সাথী তাঁকে থামিয়ে দিল।
— আচ্ছা, বিয়ের দিনও কি এত ভয় পেয়েছিলে?
— অবশ্যই।
— তাহলে বিয়ে করলে কেন?
সার্থক একটু চুপ করে থেকে মৃদু হেসে বললো — কারণ তোমার মধ্যে এমন একটা ইতিবাচক শক্তি ছিল, যা আমার সব নেতিবাচক চিন্তাকে হারিয়ে দিয়েছিল।
সাথীর মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
— তাহলে আজও সেই শক্তি আছে।
— কীভাবে বুঝলে?
— এত বছর তোমার সঙ্গে থেকেও আমি এখনও হাসতে পারি!
দু’জনেই হেসে উঠলো ।
কিছুক্ষণ পরে সার্থক বললো — জানো, একটা কথা বুঝেছি।
— কী?
— সমস্যা নিয়ে ভাবা দরকার, কিন্তু শুধু সমস্যা নিয়েই বাঁচা উচিত নয়।
সাথী বললো — একদম ঠিক। যখন সব সমস্যা মিটে যায় তখনই সুখ আসে এমনটা নয় । সুখ আসে তখন , যখন আমরা সমস্যার মাঝেও হাসতে শিখি।
তারপর একটু দুষ্টুমি করে বললো — তুমি কি জানো তোমার সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?
— কী?
— তুমি সুখ আসার আগেই দুঃখের রিহার্সাল শুরু করে দাও!
সার্থক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো ।
তারপর ধীরে বললো — সত্যিই কি তাই?
— হ্যাঁ। সাবধান হওয়া ভালো, কিন্তু সবসময় নেতিবাচক চিন্তা করলে জীবনের আনন্দগুলো অজান্তেই হারিয়ে যায়।
সেদিনের পর থেকে সার্থক নিজেকে একটু একটু করে বদলানোর চেষ্টা করতে লাগলো ।
একদিন সকালে সাথী চা এনে দিলে সে বললো — আজ চা-টা সত্যিই খুব ভালো হয়েছে।
সাথী অবাক হয়ে বললো — তোমার শরীর খারাপ নাকি?
সার্থক হেসে বললো — না। শুধু বুঝেছি, জীবনে সবসময় মেঘ খুঁজতে গেলে রোদটা আর দেখা যায় না।
সাথী বললো — এই তো! অবশেষে তোমার মাথার ওয়াই-ফাই পজিটিভ নেটওয়ার্কে কানেক্ট হয়েছে!
সার্থক মুচকি হেসে উত্তর দিল — হ্যাঁ, তবে পাসওয়ার্ডটা তোমার কাছ থেকেই পেলাম!
আবারও হাসিতে ভরে উঠল তাদের ছোট্ট সংসার।
সেদিন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল সার্থক। মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো বেরিয়ে আসছিল।
সাথী পাশে এসে দাঁড়াতেই সে বলল — জানো, এতদিন আমি ভাবতাম জীবন মানেই সমস্যার হিসাব রাখা। এখন বুঝছি, জীবন মানে আনন্দের মুহূর্তগুলোও খুঁজে নেওয়া।
সাথী মৃদু হেসে বললো — সমস্যার কথা ভুলে যেতে হবে না, শুধু তাদের জীবনের মালিক বানিয়ে ফেলো না।
সার্থক মাথা নেড়ে বললো — ঠিকই বলেছ। কারণ অন্ধকারকে গালি দিলে আলো আসে না, কিন্তু একটা প্রদীপ জ্বালালেই চারপাশ বদলে যায়।
দু’জনেই আকাশের দিকে তাকালো । মেঘ তখনও ছিল, কিন্তু তার মাঝখান দিয়ে রোদও ঝলমল করছিল।
হয়তো জীবনও ঠিক এমনই—সমস্যা থাকবে, দুশ্চিন্তা থাকবে, কিন্তু ইতিবাচক মন থাকলে প্রতিটি মেঘের আড়ালেই একটু না একটু রোদ খুঁজে পাওয়া যায়। জীবনে মেঘ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ দেখতে শেখে, তারাই সত্যিকারের সুখী।
কারণ সুখ অনেক সময় পরিস্থিতির মধ্যে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।