আমাদের জীবনের সময়স্রোত – সুপ্রিয় রায়

শৈশব

আমি তখন ছ’ কি সাত।রাস্তায় যেতে যেতে একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম – “আকাশটা নীল হয় কেন?”
বাবা একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন – “ওটা তোমার জন্য নীল, কারণ তোমার চোখে এখনও কোনো কষ্ট ঢোকেনি।”
সেদিন আমি কিছু বুঝিনি।আজ বুঝি, আসলে শৈশব মানেই সেই সময়, যখন প্রশ্ন ছিল প্রচুর, আর উত্তর দেওয়ার লোকও ছিল হাতের কাছে।
আমার শৈশবে না ছিল মোবাইল, না ছিল ইন্টারনেট।
কিন্তু ছিল এক দুধওয়ালা কাকু, যে প্রতিদিন সকালে “গুড মর্নিং” না বললে দুধ ঢালত না।
ছিল এক বাঁশির দোকানদার, যিনি বলতেন, “এই বাঁশিটা বাজালে পাখি ডাকে!”
আমি বিশ্বাস করতাম। কারণ বিশ্বাস করতে ভালো লাগত।
তখন কান্না ছিল সরল, আর হাসি ছিল অকারণ।
আজ এতগুলো বছর পরেও আমি মাঝে মাঝে সেই লাল গ্যাস বেলুনটার কথা মনে করি যার সুতোটা একদিন হাত থেকে ছুটে গিয়ে আকাশে মিশে গিয়েছিল।
আমার শৈশবটাও যেন ঠিক সেভাবেই হারিয়ে গেছে।

কৈশোর

কৈশোর আসে আকাশে রংধনুর মতো— সবকিছু চেনা, তবু সব নতুন।
আমার কৈশোরের শুরু হয়েছিল অদ্ভুত এক ঘোর থেকে। আয়নায় নিজের মুখটা হঠাৎ অন্যরকম মনে হতে শুরু করল। মনে হল, আমি আর সেই ছোট্ট বাচ্চাটা নেই। আমার ভাবনায় এসে ঢুকল এক নতুন শব্দ—”নিজেকে খুঁজে পাওয়া”।

মা যখন বলতেন, “এভাবে কথা বলা যায় না”, আমি বলতাম, “কেন যাবে না?” যা আগে শুনে নিঃশব্দে মেনে নিতাম,এখন সেটাই প্রশ্ন তুলি । যা আগে স্বাভাবিক ছিল, এখন তা অস্বস্তির।

আমার মনে হত, সবাই আমাকে বোঝে না। আসলে আমি নিজেই নিজেকে বুঝতাম না। কখনো একা থাকতে ইচ্ছে করত, আবার পরক্ষণেই একাকীত্বকে ভয় পেতাম।

একদিন স্কুলে একজনকে দেখে হঠাৎ বুকটা কেঁপে উঠল। ঠিক যেমন গল্পে পড়েছি, “ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল”। তখন বুঝিনি প্রেম কী, ভালো লাগা কী, শুধু বুঝতাম – ওর হাসি দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।

মনে মাঝে মাঝেই প্রশ্ন জাগতো – আমি কে? কী হতে চাই? সবাই যা চায়, আমাকেও কি তাই চাইতে হবে?

সেই বয়সেই প্রথম গান শুনে চোখ ভিজেছিল। কবিতায় কিছু একটা পেয়ে গিয়েছিলাম, যা বলার ভাষা ছিল না। নিজেকে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম একটা ডায়েরি— যেখানে ছিল কেবল আমি আর আমার অদ্ভুত, কাঁচা অনুভবগুলো।

কৈশোর মানে নিজের ভিতরকার যুদ্ধের সময়। হাওয়া লাগলে মনে হয় উড়ে যাবো, আবার মাটি ছুঁলেই বুঝি—আমি আছি। আজ বুঝি, কৈশোর মানে নিজেকে নিয়ে যুদ্ধ, নিজেকে গড়ার প্রস্তুতি।

তরুণ বয়স

কৈশোরের দ্বিধা পেরিয়ে তরুণ বয়সে এসে মনে হত — এখনই শুরু হবে জীবন। সব কিছুই যেন সম্ভব। আবার, সব কিছুই যেন অস্পষ্ট।

আমি তখন কলেজের প্রথম বর্ষে। প্রতিদিনই নতুন কিছু শেখার, ভাবার । চারপাশে এত আলো, এত মানুষ, এত প্রতিযোগিতা— সবকিছুর মাঝখানে আমি নিজেকে খুঁজছিলাম।

তখন আমরা প্রতিদিন নতুন নতুন পরিকল্পনা করতাম—

  • কেউ ব্যবসায়ী হতে চাইত,
  • কেউ কবি,
  • কেউবা সমাজ বদলাতে চাইত।

আমি ভাবতাম, আমিও হয়তো বদলে দেব কিছু। হয়তো একদিন আমিও স্টেজে উঠে বলব—

“বন্ধুরা, আমি সফল, কারণ আমি নিজের কথা শুনেছি।”

তরুণ বয়সে যেমন স্বপ্ন জাগে, তেমনি প্রথম বড় ব্যর্থতাটাও আসে। প্রেমে ধাক্কা, পরীক্ষায় ফল খারাপ, নিজের উপর সন্দেহ— মনে হত, সবকিছু শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, এই ভাঙাগুলোই গড়ার শুরু।

সেই সময়েই প্রথম সমাজ নিয়ে ভাবা শুরু করি। চাকরি শুধু জীবিকার জন্য নয়, একটা অর্থপূর্ণ জীবনের জন্যও দরকার।

রাজনীতি, পরিবেশ, সমানাধিকার— এসব শব্দ তখন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। আত্মজীবনী পড়তাম, বক্তৃতা শুনতাম, রাতে একলা ঘরে বসে ভাবতাম,

“এই আমি, পৃথিবীকে কী দিতে পারি?”


প্রাপ্তবয়স্কতা

“যখন তুমি প্রথম কারও জন্য চিন্তায় পড়ো, তখনই তুমি বড় হয়ে যাও।”
তরুণ বয়সের স্বপ্ন আর প্রশ্ন একসময় জায়গা করে দেয় বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার কাছে। প্রাপ্তবয়স্কতা ঠিক সেই সময়, যখন জীবন আর শুধু নিজের জন্য থাকে না।

সকালে অফিস, সন্ধ্যায় বাজার, রাতে ঘুম— দিনগুলো কেমন যেন ক্যালেন্ডারের পাতায় গাঁথা হয়ে যায়।

প্রথম বেতনের টাকায় মা-বাবার জন্য উপহার কিনেছিলাম। নিজের কিছু কেনার কথা মনেও আসেনি। সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিল – “আজ সত্যিই আমি বড় হয়েছি।”

কিছুদিন পর বিয়ে, ঘর, সন্তান— এই শব্দগুলো ধীরে ধীরে জীবনের কেন্দ্রে চলে এল। বন্ধুরা যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ল। যাদের সঙ্গে একসময় আড্ডা চলত অনেকক্ষণ পর্যন্ত, তাদের এখন রাত ১০টার মধ্যে ঘুম দরকার।

এক সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল। মেয়ে এসে জড়িয়ে ধরল—“বাবা, মিস করছিলাম।” তখনই মনে হয়েছিল  এই ভালোবাসার দায়ই আসল  জীবন।
এই বয়সে এসে প্রশ্ন করি:

  • আমি সত্যিই কী দিয়ে গেলাম?
  • আমি শুধু চাকরি করে গেলাম, না কি কিছু বদলালাম?

একজন সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানো, এক প্রতিবেশীর সমস্যায় সাহায্য করা— এই ছোট ছোট কাজেই জীবনের মানে খুঁজতে শিখলাম।

প্রাপ্তবয়স্কতা মানে নিজের জায়গা তৈরি করার সময়। চাপের ভেতরেও হাসিমুখে বাঁচার শিক্ষা। আর নিজের স্বপ্নকে অন্যদের জীবনে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা।

“এই আমি, একসময় যে শুধু স্বপ্ন দেখত, সে আজ অন্যদের স্বপ্নের রক্ষক।”

মধ্যবয়স

“আয়নায় তাকিয়ে দেখি, মুখটা আমারই… কিন্তু চোখের ভাষা অনেক কিছু বলে।”
মধ্যবয়স এমন একটা সময়, যখন জীবন অনেকটা পথ পেরিয়ে আসে। চাকরি, সংসার, সমাজ—সবই চলছে। কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা চুপচাপ প্রশ্ন মাথা তোলে: “আমি কী হারালাম, আর কী পেলাম?”

এই বয়সে এসে মানুষ আর খুব একটা দৌড়ায় না, বরং থেমে থেমে ভাবে—

  • যে স্বপ্নগুলো ছিল, তার কতটুকু পূরণ হল?
  • সংসার কি জীবনের মানে হয়ে গেল?
  • নিজের জন্য আলাদা কিছু রইল কি?

সন্তান বড় হয়ে গেছে, নিজেদের জগৎ তৈরি করছে। বাবা-মা হয়ে উঠেছি, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। বন্ধুরা ব্যস্ত, সম্পর্কগুলো যেন নিয়ম মেনে চলছে, আবেগে নয়।

এই বয়সেই আবার কেউ গান শিখতে শুরু করে, কেউ লেখে, কেউ ছবি আঁকে। মধ্যবয়স আসলে একটা পরিণত স্বপ্নের সময়, যেখানে ছোট ছোট আনন্দ আবার ফিরে আসে নতুনভাবে।

সন্ধ্যায় ছাদে বসে সূর্যাস্ত দেখছিলাম। আকাশটা লালচে হলুদে রাঙা, হঠাৎ মনে হল, জীবনটা আসলে ঠিক এরকম— দিনের আলো কমছে ঠিকই, কিন্তু রং তখনও অপূর্ব।

মধ্যবয়স মানে নিজের আয়নায় মুখোমুখি হওয়া, নিজেকে নতুন করে চিনতে শেখা। এই বয়স শেখায়—

“জীবন শেষ হয়ে যায় না, শুধু তার ছন্দটা বদলে যায়।”

বার্ধক্য

“আজকাল বেশি কিছু চাই না, শুধু সেই পুরনো দিনগুলোর গন্ধ পেলেই ভালো লাগে।”
বার্ধক্য আসে ধীরে ধীরে। কোনো ঘণ্টা বাজে না, কোনো ঘোষণা হয় না। একদিন হঠাৎ দেখি, সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশি সময় লাগে, হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে যাই, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই চিনতে কষ্ট হয়।

বার্ধক্য মানে শুধু শরীরের ক্লান্তি নয়, একটা সময়ের বিচ্ছিন্নতাও।

একাকীত্ব বাড়ে। সন্তান দূরে, বন্ধুরা অনেকেই নেই।
এই বয়সে এসে সবকিছু স্মৃতিতে রূপ নেয়। ছেলের প্রথম হাঁটা, মেয়ের বিয়ের দিন, প্রথম চাকরির চিঠি, পুরনো বন্ধুদের আড্ডা…

একটা পুরনো বাক্সে রাখা ছবি হাতে নিলে মনে হয়, জীবন যেন এক সিনেমা, যার দৃশ্যগুলো কেবল আমিই মনে রাখি।

ছোট ছোট আনন্দই এখন বড় ।  নাতি – নাতনির হাত ধরা, পুরনো গান শোনা।
মাঝে মাঝে ভাবি—আর কতদিন? আবার ভাবি—যা বেঁচেছি, ভালোবেসেছি, কেঁদেছি, হেসেছি—এটাই কি কম কি?
বার্ধক্য মানে থেমে যাওয়া নয়, বরং নিজের জীবনের গল্পটা মন খুলে বলার সময়। কারণ এ বয়সে কেউ কিছু প্রমাণ করতে চায় না, শুধু চায়—কেউ একজন মন দিয়ে শুনুক।পরিশেষে বলি –

বয়স বাড়ে শরীরে, মন তো চিরসবুজ!”

আপনার অভিজ্ঞতা এই সমাজের অমূল্য সম্পদ।
আপনার গল্প, আপনার লড়াই, আপনার হাসি—সব কিছু আজকের প্রজন্মকে পথ দেখায়।
জীবনের প্রতিটি দিনই নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আসে।
আজও আপনি নতুন কিছু শুরু করতে পারেন,
আজও আপনি কাউকে অনুপ্রাণিত করতে পারেন।

আপনি এখনো প্রয়োজনীয়, আপনি এখনো প্রেরণা
বয়স নয়, মনটাই আসল। মনকে কখনো বুড়ো হতে দেবেন না!

Leave a comment