সকালের অ্যালার্মটা বাজতেই সাথীর ঘুম ভাঙল।ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা। চোখ খুলেই তার মাথায় একগাদা হিসেব— সকালের জলখাবার , ছেলেকে স্কুলের জন্য তৈরি করা, নিজের অফিসের প্রেজেন্টেশন, আর শাশুড়ির ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
পাশে শুয়ে থাকা সার্থক তখনও আধো ঘুমে।
সাথী একটু বিরক্ত গলায় বলল,— “শুধু আমারই কি সকাল শুরু হয়?”
সার্থক চোখ মেলে হেসে বলল,— “ঠিক আছে, আজ চা আমি করছি।”
সাথী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,— “শুধু চা করলে হবে? সংসারটা তো চা দিয়ে চলে না।”
কথাটা শুনে সার্থক একটু চুপ করে গেল।
দু’জনেই চাকরি করে।
সার্থক একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে, আর সাথী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করে।
বাইরে থেকে সবাই বলে,“কী সুন্দর মডার্ন কাপল!”
কিন্তু বাস্তব ছবিটা একটু আলাদা।
অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে দু’জনেরই ক্লান্তি চরমে ওঠে।
তারপরও রান্না, সন্তানের পড়া, সংসারের হিসেব— সব অপেক্ষা করে থাকে।
একদিন রাতে সাথী ল্যাপটপ খুলে কাজ করছিল।
সার্থক বলল,— “এত রাতে আবার কাজ?”
সাথী বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল,— “কাজটা তো নিজে নিজে হবে না।”
— “কিন্তু তোমাকে খুব ক্লান্ত লাগছ।”
সাথী হঠাৎ বলে ফেলল,— “ক্লান্ত তো লাগবেই। অফিসেও দায়িত্ব, বাড়িতেও দায়িত্ব। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি শুধু কাজ করার মেশিন।”
সার্থক এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল।
সে শান্তভাবে বলল,— “তুমি আগে বলোনি কেন?”
সাথী একটু হেসে বলল,— “সব কথা কি না বললে বোঝা যায় না ?”
সার্থক মৃদু হেসে উত্তর দিল,— “আমি তো মানুষ, মনের খবর পড়ার যন্ত্র নই।”
দু’জনেই একটু হেসে ফেলল। পরিস্থিতি নরম হলো।
পরদিন রবিবার সকালে সার্থক একটা কাগজ নিয়ে বসল।
— “এটা কী?” জিজ্ঞেস করল সাথী ।
— “নতুন প্ল্যান।”
কাগজে লেখা—
সোম, বুধ, শুক্র: রান্নাঘরে সার্থক
মঙ্গল, বৃহস্পতি: সন্তানের পড়া দেখবে সার্থক
রবিবার : বাইরে থেকে খাবার, no cooking day, দুজনে মিলে ঘর পরিষ্কার , জামা কাপড় ধোঁয়া , আয়রন করা ইত্যাদি
সাথী অবাক।— “এত আয়োজন?”
সার্থক বলল,— “সংসার দু’জনের। তাহলে দায়িত্বও দু’জনের হওয়া উচিত।”
সাথীর চোখ ভিজে উঠল।— “জানো, আমার খুব বড় কিছু দরকার ছিল না। শুধু দরকার ছিল একটু সহযোগিতা।”
সার্থক মুচকি হেসে বলল,— “আর আমার দরকার ছিল একটু স্পষ্ট নির্দেশনা!”
আবার হাসি।
ধীরে ধীরে তাদের সংসারে ছোট্ট পরিবর্তন এল।
কাজ কমল না, দায়িত্বও কমল না— কিন্তু চাপটা ভাগ হয়ে গেল।
রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাথী বলল,— “কর্মজীবন আর সংসার একসঙ্গে সামলানো খুব কঠিন।”
সার্থক উত্তর দিল,— “হ্যাঁ, একা সামলানো কঠিন। কিন্তু একসঙ্গে সামলানো অনেক সহজ।”
সাথী তার কাঁধে মাথা রাখল।
জীবনে ভারসাম্য মানে সবকিছু নিখুঁত হওয়া নয়।বরং কে কখন ক্লান্ত, কে কখন সাহায্য চায়— সেটা বুঝতে পারাই আসল ভারসাম্য।
সংসারে দায়িত্ব ভাগ করলে শুধু কাজই কমে না, সম্পর্কের চাপও অনেক হালকা হয়।