বর্ষার পরের নরম বিকেল । আকাশে রোদের রং ফিকে হয়ে এসেছিল । জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়ছিল বিছানার ওপর। ঘরের মধ্যে হালকা সুবাস ছড়িয়ে পড়ছিল চারিদিকে । কোথাও একটা পাখি ডাকছিল আপনমনে । আর বিছানার মাঝখানে গোল হয়ে শুয়ে ছিল ছয় মাসের ছোট্ট সহেলি ।এই ছোট্ট মানুষটা এখনও কথা বলতে পারে না। কিন্তু সে যেন হাসি দিয়ে পৃথিবীর সব ভাষা বুঝিয়ে দেয়।
দু’পা উপরে তুলে সে নিজের পায়ের আঙুল ধরার চেষ্টা করে । কখনও পায়, কখনও পায় না। পেলেই মুখে দেওয়ার চেষ্টা।
দাদু পাশে বসে মুগ্ধ চোখে দেখছিল ।
— “ওমা! নিজের পা নিজেই খেয়ে ফেলবে নাকি?”
সহেলি সঙ্গে সঙ্গে “আআআ… উউউ…” করে হেসে উঠলো ।
ঠাকুমা বললো — “এই বয়সে সবকিছুই ওদের কাছে খেলনা।”
ঠাকুমা পাশে বসে শুধু দেখছিল । এই দৃশ্যগুলো সে বুকের ভেতর জমিয়ে রাখছিল ।কারণ সে জানে, শিশুরা বড় হয়ে যায় খুব দ্রুত।এই ছোট ছোট বিকেলগুলো একদিন শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে।
সহেলি এবার গড়িয়ে পাশ ফিরলো । খুব কষ্ট করে উপুড় হওয়ার চেষ্টা করছিল । একবার হচ্ছিল , আবার ধপাস করে ফিরে যাচ্ছিল।
বাড়ির সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল যেন বড় কোনও ম্যাচ চলছিল ।
— “হবে হবে! আরেকটু… আরেকটু!”- সবাই একসাথে চীৎকার করে সহেলিকে সাহস দিচ্ছিল ।
অবশেষে সহেলি উপুড় হতে পেরে বিজয়ীর মতো মুখ তুলে তাকাল।তারপর এমন এক হাসি দিল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজ সে করে ফেলেছে।
সবাই হাততালি দিয়ে উঠল , দাদু বলে উঠল—“বাহ্! আমাদের সহেলি তো একেবারে জিমন্যাস্ট!”
ঠাকুমা এত জোরে হেসে ফেলল যে তাঁর চশমা নাক থেকে নেমে এল।
কিছুক্ষণ পর শুরু হলো আরেক কাণ্ড।
সহেলি বিছানায় বসতে শিখছে। চারপাশে বালিশ দিয়ে ওকে বসিয়ে রাখা হয়েছিল । সে একটু বসে, তারপর দুলে যায়। আবার সামলে নেয় নিজেকে।
হঠাৎ সামনে রাখা লাল রঙের ঝুমঝুমি দেখে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
দু’হাত বাড়িয়ে ধরল।মুখে পুরে দিল।তারপর নাড়াতে নাড়াতে নিজেই চমকে উঠল শব্দ শুনে।
“ঝুনঝুন ঝুনঝুন…”
সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।আবার নাড়াল।আবার শব্দ।তারপর আনন্দে দুই পা ছুঁড়তে লাগল।
দাদু বলল—“দেখেছো! মনে হচ্ছে নতুন কোনও যন্ত্র আবিষ্কার করেছে!”
ঠাকুমা বলল—“ওর কাছে তো সবই নতুন।”
ঠিক তখন সহেলির চোখ গিয়ে পড়ল ওর দাদুর মোবাইলের দিকে ।
সে হামাগুড়ির ভঙ্গিতে একটু একটু করে এগিয়ে এল।তারপর আচমকা মোবাইল চেপে ধরল।
— “উফফ! আরে আরে!”
দাদু এমন মুখ করল যে সহেলি খিলখিল করে হেসে উঠল।সেই হাসি শুনে ঠাকুমা, দাদু হেসে কুটিপাটি।
একটু পরে ঠাকুমা রান্নাঘর থেকে ফিরে দেখল— দাদু মেঝেতে বসে আছে ,আর সহেলি তাঁর হাঁটুর ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
ছোট্ট দুই পা কাঁপছিল । একবার উঠছিল ,একবার বসে পড়ছিল ।কিন্তু তার মুখে ছিল অদ্ভুত সাহস।
দাদুর চোখ ভিজে উঠল আনন্দে।
দাদু ধীরে বললো —“এই তো জীবন… এভাবেই মানুষ প্রথম দাঁড়াতে শেখে।”
সহেলি এসব কিছুই বোঝে না । সে শুধু দাদুর মুখ দেখে হাসে।
তারপর সে হাত বাড়াল দাদুর দিকে।দাদু কোলে নিতেই ছোট্ট মাথাটা এসে থামল তাঁর বুকে।এক মুহূর্তের জন্য সময় যেন একদম ধীরে চলতে লাগল।
দাদুর বুকের ভেতর কেমন নরম একটা ঢেউ উঠল।
এই বয়সে এসে মানুষ অনেক কিছু হারায়— শক্তি, বন্ধু, পুরনো দিন…
কিন্তু এই ছোট্ট নরম হাত দুটো যেন সব হারানো জিনিসের বদলে নতুন আলো এনে দিল ।
হঠাৎ নাতনি দাদুর কোল থেকে ঠাকুমার দিকে ঝুঁকে পড়ল।
ঠাকুমা কোলে নিতেই সে খিলখিল করে হেসে উঠল।সেই হাসির শব্দে যেন পুরো বাড়িটার মন ভালো হয়ে গেল।
ঠাকুমা মৃদু গলায় বললো — “দেখেছো? ও শুধু কোলে আসে না… মনেও এসে বসে।”
দাদু কিছু বললো না । শুধু নাতনির মাথায় আলতো করে হাত রাখলো ।তারপর সহেলি হঠাৎ করে লালা মাখা হাত দিয়ে দাদুর গাল চাপড়ে দিল ।
ঠাকুমা বললেন— “দেখেছো? আদর করছে!”
দাদু হেসে উত্তর দিলেন— “না গো… এ তো আমাকে নিজের মানুষ বানিয়ে নিচ্ছে।”
বাইরে তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। পাশের মন্দির থেকে ভেসে আসছিল ঘণ্টার মধুর ধ্বনি। আকাশ জুড়ে একে একে জ্বলে উঠেছিল ছোট ছোট তারারা। চারপাশ যেন এক শান্ত, স্নিগ্ধ আবেশে ভরে উঠেছিল।
আর ঘরের ভেতর,
একটি ছয় মাসের শিশুর ছোট ছোট হাত-পা নাড়া,
অস্পষ্ট মিষ্টি আওয়াজ,
কারণহীন এলোমেলো হাসি,
আর কোল থেকে কোলে যাওয়ার সেই টলমল চেষ্টাগুলো—
দুজন বয়স্ক মানুষের জীবনটাকে মুহূর্তেই আনন্দের উৎসবে ভরিয়ে তুললো ।
শিশুটির প্রতিটি হাসি যেন তাদের কাছে নতুন রোদ হয়ে ফুটে উঠছিল,
প্রতিটি অস্পষ্ট আওয়াজ যেন ঘরের নীরবতায় প্রাণের সুর তুলছিল।
সন্ধ্যার শান্ত আলোয় দাদু-ঠাকুমার চোখে তখন শুধু একরাশ তৃপ্তি, বিস্ময় আর নিখাদ ভালোবাসা ঝলমল করছিল।
Partha Pratim Dasgupta
ছোট্ট নাতনিকে নিয়ে দাদু-দিদার আবেগ, অনুভূতি আর উচ্ছাস প্রকাশ পেল তোমার সমগ্র লেখায় আর ছবিতে। যা থেকে আমিও দাদুর স্বাদ পেলাম। তবে নাতনির হাসির ফোয়ারা আমার এত ভালো লেগেছে যে আমি কয়েকবার দাদুর কোলে নাতনির হাসি দেখেছি।
LikeLike
Reena Dasgupta
এই সময়টা খুব সুন্দর কি ভাবে যে কেটে যায় বুঝতেই পারা যায় না
LikeLike
Aparajita Sengupta
ছোট্ট সহেলি র প্রতি দাদু ও ঠাকুমার অফুরান ভালোবাসা আমাদের মনকে ছুঁয়ে গেল। অনেক ভালোবাসা রইল নাতনি র জন্য। কি সুন্দর অনুভূতি দিয়ে তুমি লিখেছো। খুব ভাল লাগল।
ছবি গুলো খুব সুন্দর হয়েছে
LikeLike
Tapashi Banerjee
অসাধারণ লিখেছ।কি সুন্দর অনুভূতি। আবেগের ছোয়ায় অনন্য তোমার সহেলী।
LikeLike
Moumita Roy Dasgupta
Opurbo tilok kaku, tomader shannidhyo tomader saheli tomader bandhobi ke ro shombriddho koruk, grandparents der kache toh asholer cheye sood priyo. Amio maa-babai ke dekhechi toh, tomader moton unconditional bhalobasa ador r sneho keu dite parbe naa, onek onek ador roilo saheli ranir jonno.
LikeLike
Dodul Naskar
Lot’s of love So sweet
LikeLike
Champak Mitra
নাতি তার পছন্দের ঠাকুরদা এবং ঠাকুরমার স্নেহের পাত্র হয়ে উঠেছে
LikeLike
Aparna Mukherjee
Ki ashadharon lekha. Mone hochchhe jano chokher shamne dekhchhi. Chhobiguli o khub shundar. Khub enjoy Karo .
LikeLike
Chandana Banerjee
খুব সুন্দর লেখা।আর খুব মিষ্টি ওই ছোট্ট মানুষটি। অনেক আদর রইলো ওর জন্য।
LikeLike
Sucheta Sen
Ki mistiiiii
LikeLike
Shibani Roychowdhury
বেশ আদর খেতে ভালবাসে দাদু ঠাম্মির,বোঝা যাচ্ছে।
LikeLike
Biman Kumar Chatterjee
A good frame of a happy family!!



LikeLike
Bani Paul
Ashadharon picture….ar anubhuti .
LikeLike
Ranadhis Banerjee
মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা। খুব সুন্দর লিখেছেন।
LikeLike
Dalia Deb
Ashadharon upolobdhi…….pore valo laglo



LikeLike
Chaitalee Roy
Ki ashadhoron chobi
amra.khub miss korchi aei muhurto gulo ke
LikeLike
Swapan Dattaray
Best gift of God .
LikeLike
Ila Dey
So pretty
LikeLike
Ranjit Sen
Precious
LikeLike
Surajit P Choudhury
Beautiful Mind Blowing Superb Enjoy with Grand Daughter

LikeLike
Prokash Bhowmick
Sundar chhabigulo saha apurba apurba sundar lekha Natni ke niye sundar bhabna r asamanya prakash Lekhanir gune mone hochchhe video dekhchhi Pishididar janya anek anek adar pranbhara bhalobasa o ashirbad railo
LikeLike