রাত তখন প্রায় সাড়ে ন’টা।
অফিসের কাচঘেরা বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে গভীর একটা নিশ্বাস নিল সুবিমল। সারাদিনের ক্লান্তি শরীরে জমে আছে। কিন্তু এখন একটাই লক্ষ্য—শেষের দিকের মেট্রোটা ধরতে হবে।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও ও ফলের বাজারের ভেতর দিয়ে দ্রুত হাঁটছিল। বাজার প্রায় বন্ধ। আধভাঙা আলো, পচা ফলের গন্ধ, দূরে কুকুরের ডাক—সব মিলিয়ে জায়গাটা অদ্ভুত নির্জন লাগছিল।
হঠাৎ—
একটা ভারী হাত এসে পড়ল ওর কাঁধে।
সুবিমল ঘুরতেই দেখল, বিশাল চেহারার এক লোক। ঘন দাড়ি, কড়া চোখ, মাথায় টুপি । লোকটা ঠান্ডা গলায় বলল—
— “চুপচাপ সামনে হাঁটো। আওয়াজ করলে এখানেই শেষ করে দেব।”
সঙ্গে সঙ্গে সুবিমল অনুভব করল, লোকটার পাঞ্জাবির পকেটের ভিতর থেকে শক্ত কিছু ওর পিঠে ঠেকানো।
বন্দুক!
সুবিমলের গলা শুকিয়ে গেল।
চারপাশে তাকাল সে। আশ্চর্য ব্যাপার—বাজারের লোকজন সব দেখেও যেন কিছু দেখছে না। দু-একজন চোখ নামিয়ে নিল। কেউ দ্রুত দোকান গুটোতে লাগল।
লোকটা আবার বলল— “বেশি বুদ্ধি দেখানোর চেষ্টা কোরো না।”
সুবিমল বুঝল, ফাঁদে পড়ে গেছে।এটাও বুঝল যে এদের উদ্দেশ্য ছেনতাই করা , কেননা ওকে ধরার আর কোন কারণ থাকতে পারে বলে ওর মনে হোল না ।
ওকে নিয়ে ঢোকা হল একটা সরু গলিতে। গলির শেষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো বাড়িটা দেখে বুকটা কেঁপে উঠল। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে। জানালার কাচ ভাঙা। ভিতর থেকে মৃদু আলো বেরোচ্ছে।
দরজা খুলতেই ভেসে এল বিড়ির গন্ধ।
ভিতরে আরও দুজন বসে ছিল।
— “ওস্তাদজি এসে গেছে!”
কথাটা শুনেই সুবিমলের বুকের ভিতর ঠক করে উঠল।
একজন উঠে এসে ছুরি বের করল।
— “যা আছে বের কর।”
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওর মানিব্যাগ, ঘড়ি, আংটি, মোবাইল—সব উধাও।
সুবিমলের মাথার ভিতর তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে—“এরা কি আমাকে বাঁচতে দেবে?”
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
ওকে একটা পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসিয়ে রাখা হল। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা মোবাইলে কারও সঙ্গে কথা বলছে—
— “হ্যাঁ… কিছু মাল পাওয়া গেছে…”
“মাল?”
সুবিমলের বুক ধড়ফড় করে উঠল।
ঠিক তখনই ভিতরের ঘর থেকে ভেসে এল আরেকটা কথা—
— “একে রেখে দেওয়া ঠিক হবে তো?”
সুবিমলের শরীর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
ও বুঝল—সময় খুব কম। স্ত্রী, মেয়ে, বৃদ্ধ মা… সবাইয়ের মুখ ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। যদি আজ কিছু হয়ে যায়? ওরা তো জানতেও পারবে না কী হয়েছিল!
লোকটা ফোনে ব্যস্ত। বাকি দুজন ভিতরে গেছে।
এটাই সুযোগ।
আস্তে আস্তে চেয়ার থেকে উঠল সুবিমল।
মেঝের পুরোনো কাঠ কড়মড় শব্দ করল।
লোকটা একটু ঘুরতেই—
সুবিমল দৌড়!
পিছন থেকে চিৎকার ভেসে এল—
— “ধর! পালাচ্ছে!”
গলির ভিতর প্রাণপণে ছুটছে সুবিমল। পিছনে ভারী পায়ের শব্দ।
একবার পিছনে তাকাতেই দেখল দুজন লোক দৌড়ে আসছে।
আরও জোরে দৌড়াল সে।
বাজারের লোকজন সরে দাঁড়াচ্ছে। কেউ কিছু বলছে না।
মেট্রো স্টেশনের আলো চোখে পড়তেই যেন নতুন শক্তি পেল সুবিমল।
কার্ডটা এখনও শার্টের ভিতরের পকেটে!
সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেল সে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা গর্জন—
— “ধর ওকে!”
ট্রেনের দরজা বন্ধ হওয়ার আগের মুহূর্তে ভিতরে ঢুকে পড়ল সুবিমল।
দরজা বন্ধ।
প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে সুবিমলের মনে হল—ওরা এখনও ওকে দেখছে।
পুরো রাস্তা ওর মনে হচ্ছিল, কেউ যেন পিছু নিয়েছে। ট্রেনের সিটে বসে তখনও ওর হাত কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি কেউ এসে কাঁধে হাত রাখবে।
বাড়ি পৌঁছে দরজা বন্ধ করেও ভয় কাটল না।
পাশের ফ্ল্যাটের পুলিশ অফিসার সব শুনে শুধু বললেন—
— “ওদের বিরুদ্ধে যাওয়া খুব বিপজ্জনক। রাজনৈতিক হাত আছে। পুলিশও অনেক সময় কিছু করতে পারে না।”
সেই রাতে ঘুমোতে পারেনি সুবিমল।
কিন্তু কয়েকদিন পরে একটা খবর শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
অপরাধ জগতের কুখ্যাত “ওস্তাদজি” গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য গ্রেফতার।
খবরটা দেখে সুবিমল চুপ করে বসে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল।
রাস্তার আলোটা আজ অনেক উজ্জ্বল লাগছিল।